প্রতিযোগীদের থেকে দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে, সন্দেহ নেই। তবু ‘রেস’ জিততে মরিয়া এ রাজ্যের পর্যটন নিগম। খামতি মেটাতে সম্প্রতি বদল এসেছে ট্যুরিস্ট লজের খাবারের মেনু থেকে পর্দার কাপড়, বিছানার চাদরে। এ বার চিরাচরিত সরকারি লজকে ‘কর্পোরেট’ ধাঁচে সাজতে চাইছেন রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের কর্তারা।
পর্যটন নিগম সূত্রের খবর, লজের বহিরঙ্গে বদল এলেও বহু ক্ষেত্রে পরিষেবায় খামতি থেকে যাচ্ছিল। যার পিছনে কর্মী-অফিসারদের অপেশাদারি মনোভাবকেই দায়ী করছেন কর্তারা। সেই খামতি মেটাতে এ বার লজের পরিচালন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজার বন্দোবস্ত করেছে নিগম। তাদের কর্তারা জানান, এ বার থেকে লজে এক জনের বদলে সব সময়ে নিগমের নিজস্ব তিন জন ম্যানেজার থাকবেন। তাঁদের এক জন খাবার ও পানীয় সংক্রান্ত দায়িত্ব সামলাবেন, এক জন দেখবেন আতিথেয়তা বা হসপিটালিটির দিক। অন্য জন বুকিং-বিল সংক্রান্ত কাজকর্ম দেখভাল করবেন। পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ বন্ধ রেখে ঠিকাদার সংস্থার মাধ্যমে পেশাদার কর্মী নিয়োগ করা হবে।
বেড়াতে গিয়ে ট্যুরিস্ট লজে উঠে কর্মীদের মেজাজ সয়েছেন এমন পর্যটকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কখনও সামান্য মাল বইতে ১০০ টাকা চাওয়া হতো, কখনও বা ঘরে চা পৌঁছে দিতে হলেও ‘বকশিস’ বাধ্যতামূলক ছিল। নিগমের কর্তারাও কর্মীদের এই মনোভাবের কথা মেনে নিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, সম্প্রতি একটি ট্যুরিস্ট লজে ঘরে চা দিতে বলেছিলেন এক দম্পতি। ওই দায়িত্বে থাকা কর্মী তার জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা চান। সেই অভিযোগ লিখিত ভাবে নিগমের শীর্ষস্তরে জানান দম্পতি। নিগমের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘‘অভিযোগ খতিয়ে দেখে ওই কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাকা চাকরি মানেই কাজ করতে হবে না, এই ধারণা কর্মীদের বেশির ভাগের মনে গেড়ে বসেছে।’’ নিগম সূত্রে বলা হচ্ছে, এই রীতিনীতি বদলাতেই স্থায়ী কর্মী কমাতে চাইছেন তাঁরা। দীর্ঘদিন ধরে একই লজে চাকরি করতে করতে মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসেছেন, এমন কর্মীদের চিহ্নিত করে বদলিও করা হচ্ছে।
যেমন শিলিগুড়ির মৈনাক হোটেলেই এসেছে পরিবর্তন। পর্যটক টানতে আরও এক দফা পরিবর্তনের পথে চলেছে দফতর। মৈনাকের খোলনলচে বদলানোর ঘোষণা করেছেন রাজ্যের পযর্টনমন্ত্রী গৌতম দেব। দফতর সূত্রের খবর, অতিথি নিবাসের বাইরের বাগানটিকে ঢেলে সাজার কথা ঠিক হয়েছে। ভবন, রিসেপশন, রেস্তোরাঁর পুরো সংস্কার করা হবে। নতুন দু’টি অনুষ্ঠান ভবনও তৈরি হয়েছে। তার একটির ভাড়া প্রায় ২ লক্ষ টাকার মতো রাখা হয়েছিল। মন্ত্রীর নির্দেশে তা ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি করা হয়েছে। পাশাপাশি, ওই ভবন ভাড়া নিলেই কয়েকটি ডিলাক্স ঘর পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। বসানো হয়েছে নতুন জেনারেটর। পার্কিং এলাকাকে বড় করা হয়েছে। তেমনিই, রেস্তোরাঁটিকে ঢেলে সাজা হবে বলে ঠিক হয়েছে। পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষা করিয়ে, খাবারের মেনু থেকে কর্মীদের পরিষেবার দিকটি বদল করা হবে বলে ঠিক হয়েছে। ইতিমধ্যেই লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে মৈনাক।
গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচলের মতো রাজ্য পর্যটনের ব্যবসায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এ রাজ্যের মেট্রোর কামরা, রাস্তা তাদের বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ। এ রাজ্যে পর্যটনের উপাদান থাকলেও তাকে বহু দিন কাজে লাগাতে পারেনি নিগম। তবে এখন প্রতিযোগীদের পাল্লা দিতে মাঠে নেমেছে তারাও। মেট্রোর কামরা, রাস্তায় প্রতিযোগীদের সঙ্গে এ রাজ্যের পর্যটনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। তাতে লজের ভাড়া, পরিবেশ, পরিষেবার কথা বলা হয়েছে। নিগমের এক কর্তার মতে, ‘‘বিজ্ঞাপন দিলেই তো হবে না। বাস্তবটা যেন তার সঙ্গে মেলে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’’ ওই কর্তা জানান, শিলিগুড়ির মৈনাক ট্যুরিস্ট লজের ক্ষেত্রে কর্পোরেট কায়দা কিছুটা চালু করা হয়েছে। তাতেই ক্ষতির ধাক্কা পুষিয়ে লাভের মুখ দেখেছে ওই লজ।
নিগমের এক কর্তা জানান, পরিচালন ব্যবস্থা, কর্মী নিয়োগে বদল আনার পাশাপাশি নিগমের ওয়েবসাইট, ট্যুরিস্ট লজের বুকিংয়েও বদল আনা হয়েছে। অফ-সিজনে পর্যটক টানতে বড় অঙ্কের ছাড়ও ঘোষণা করেছেন নিগমকর্তারা। অনলাইন বুকিংয়ের আগে লজের ঘর, বারান্দা, চানঘর এমনকী, চারপাশের ছবিও দেখে নিতে পারবেন লোকজন। এ জন্য পেশাদার সংস্থা নিয়োগ করে অ্যালবাম তৈরি করা হয়েছে। পর্যটক টানতে কর্পোরেট সংস্থার আদলে রাজ্যের নানা জায়গায় ঘোরানোর জন্য অন্তত ৪০টি প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। নিগমের এক শীর্ষকর্তার দাবি, ‘‘একসঙ্গে ৪০টি প্যাকেজ এর আগে কখনও চালু করা হয়নি।’’