Advertisement
E-Paper

এ বার বাবা-ছেলে সন্দেহভাজন পাক চর, ধৃত ছেলের মামাও

বাবা-ছেলে দু’জনেই ধৃত দেশদ্রোহের অভিযোগে। গার্ডেনরিচে নৌসেনার জাহাজ তৈরির কারখানায় সে ছিল অস্থায়ী কর্মী। কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে সেখানে বসে সে দেশের সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাক গুপ্তচর সংস্থার কাছে পাচার করছিল, এমনই অভিযোগ উঠেছে মেটিরাবুরুজের বাসিন্দা ইরশাদ হায়দারের বিরুদ্ধে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৫ ১৫:৩৫

বাবা-ছেলে দু’জনেই ধৃত দেশদ্রোহের অভিযোগে।

গার্ডেনরিচে নৌসেনার জাহাজ তৈরির কারখানায় সে ছিল অস্থায়ী কর্মী। কিন্তু তার সুযোগ নিয়ে সেখানে বসে সে দেশের সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাক গুপ্তচর সংস্থার কাছে পাচার করছিল, এমনই অভিযোগ উঠেছে মেটিরাবুরুজের বাসিন্দা ইরশাদ হায়দারের বিরুদ্ধে।

আবার মধ্যবয়সী ইরশাদের ছেলে আসফাকের বিরুদ্ধেও দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক, এমন তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। তার ছেলে আসফাকের বিরুদ্ধেও।

দু’জনকেই গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)।

পুলিশ সূত্রের খবর, আসফাক আবার গার্ডেনরিচের একটি কলেজের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতাও।

ইরশাদ কলকাতায় এক পাক নাগরিক ও আইএসআইয়ের বড় মাপের এজেন্টকে বছর দেড়েক থাকার ব্যবস্থা করে দেয় বলে জেনেছে এসটিএফ। শুধু তা-ই নয়, তাদের বক্তব্য, ইরশাদের শ্যালক জাহাঙ্গির আবার ওই এজেন্টকে ভারতীয় হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য ভুয়ো নামে তার পাসপোর্ট, সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড তৈরি করে দিয়েছিল। জাহাঙ্গিরকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

গোয়েন্দাদের দাবি, গার্ডেনরিচে নৌসেনার জাহাজ তৈরির কারখানার কিছু গোপন তথ্য, নথি ও ছবি পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের হাতে ইরশাদ তুলে দিয়েছে।

গত ১৪ নভেম্বর মধ্য কলকাতার কলুটোলা থেকে সন্দেহভাজন পাক চর আখতার খানকে গ্রেফতার করে এসটিএফ, দু’দিন পরে তার ভাই জাফরকেও গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, ওই দুই ভাই পশ্চিমবঙ্গ-সহ পূর্ব ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন সেনা ছাউনি ও সেনা ঘাঁটি এবং সেনার গতিবিধির ব্যাপারে গোপন তথ্য পাকিস্তানে পাচার করত।

পুলিশ সূত্রের খবর, মেটিয়াবুরুজের ইরশাদের ছেলে আসফাক দু’বার বাংলাদেশে গিয়ে বাবার দেওয়া ভারতীয় নৌবাহিনীর কিছু গোপন তথ্য ও ছবি সেখানকার কিছু লোকের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে।

আইএসআইয়ের যে এজেন্টকে ইরশাদ মেটিয়াবুরুজে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, সেই পাক নাগরিক মহম্মদ কালাম ওরফে ইজাজ-ই শুক্রবার মেরঠে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এসটিএফের হাতে ধরা পড়েছে। তাকে জেরা করেই জানা যায় ইরশাদের কথা। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ওই ইজাজ এক জন বড় মাপের আইএসআই এজেন্ট। চরবৃত্তির জন্য মাসে তাকে লাখ খানেক টাকা দেওয়া হত। ইজাজেরই কার্যত সাব-এজেন্ট হিসেবে ইরশাদ, আসফাক কাজ করত।

উত্তরপ্রদেশ এসটিএফের আইজি সুজিত পাণ্ডে বলেন, ‘‘মেটিয়াবুরুজে ইজাজ কেবল দেড় বছর বসবাস করেছে এমন নয়, কলকাতায় সে আরও কিছু সহায়তা পেয়েছে, যার ফলে কলকাতা থেকে সে বরেলিতে চলে এসে কাজ করতে পারে।’’

আইএসআই-এজেন্ট হিসেবে কী কাজ করত ইজাজ?

আইজি-র কথায়, ‘‘আমরা যতদূর জেনেছি, আইএসআই এজেন্ট হিসেবে ইজাজের কাজের জায়গা ছিল উত্তরপ্রদেশ। মেরঠ, বরেলি, আগ্রা-সহ বিভিন্ন এলাকার ভারতীয় সেনা ও বায়ুসেনার ঘাঁটি, বিমান, অস্ত্রশস্ত্র এবং সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে প্রচুর গোপন তথ্য পাকিস্তানে পাচার করেছে ইজাজ।’’

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্য, পাকিস্তানের নাগরিক ইজাজ আইএসআইয়ের কাছে চরবৃত্তির প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে ঢোকে। বসিরহাট সীমান্ত দিয়ে জলপথে এ দেশে ঢুকে ২০১৩ সালের অগস্ট মাসে সে মেটিয়াবুরুজে ইরশাদের কাছে যায়।

তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, করাচিতে ইরশাদের কয়েক জন আত্মীয় রয়েছেন। সেই সূত্রেই ইজাজের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল ইরশাদের। কলকাতার একটি ব্যাঙ্কে ইজাজের অ্যাকাউন্টও ছিল। পাকিস্তানে নথি ও তথ্য পাচারের জন্য সেই অ্যাকাউন্টে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা আসত । ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইজাজ কলকাতায় ছিল। সেই সময়ে সে ইরশাদ মারফত গার্ডেনরিচে নৌসেনার জাহাজের বিভিন্ন তথ্য ও ছবি পাকিস্তানে পাচার করত।

গোয়েন্দাদের দাবি, গার্ডেনরিচ শিপ বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অস্থায়ী পদে কাজ করত ইরশাদ। তার উপরে গত কয়েক বছর ধরেই নজর রাখা হচ্ছিল। মেরঠ থেকে ইজাজ ধরা পড়ার পরে তাকে জেরা করেই ইরশাদের কথা জানা যায়। ইজাজ জানিয়েছে, সে কলকাতায় আসার পরে ইরশাদ টাকার বিনিময়ে তার হাতে গার্ডেনরিচের ছবি ও তথ্য তুলে দিতে শুরু করে।

প্রশ্ন উঠছে, গার্ডেনরিচের জাহাজ কারখানার মতো এত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে এ ভাবে ছবি তুলে বা তথ্য যোগাড় করে বাইরে কী করে পাচার করল ইরশাদ? কারখানার ভিতরে সেনাবাহিনীর কোনও নজরদারি কি ছিল না? তা ছাড়া, একজন লোকের নাম-ঠিকানা- ঠিকুজি ভাল ভাবে যাচাই না করেই কী করে তাকে জাহাজ তৈরির কারখানায় কাজে নেয় সেনাবাহিনী? অভিযোগ, শুধু নিজে নয়, নিজের ক্ষমতা বলে কখনও বাইরের লোককেও ‘ডেইলি পাস’ বানিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে ইরশাদ। সেই ভাবে ইজাজও গার্ডেনরিচের ভিতরে ঢুকে থাকতে পারে বলে সন্দেহকরা হচ্ছে। প

প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্রে বলা হচ্ছে, এই ধরনের সংস্থায় যারা পাকাপাকি ভাবে চাকরি করেন, তাঁদের নিয়োগের আগে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সব তথ্য খতিয়ে দেখে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদার সংস্থার মাধ্যমে ইরশাদের মতো অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। তাঁদের ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড খতিয়ে দেখা হলেও গোয়েন্দা নজরদারি সম্ভব নয়। তার উপরে ইরশাদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু পুলিশ অফিসারের দহরম-মহরম ছিল চোখে পড়ার মতো বলে জানা গিয়েছে। উপরন্তু তার ছেলে শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা।

দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গার্ডেনরিচ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কেন্দ্রীয় ও সেনা গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, জঙ্গি হানা বা বিদেশি আক্রমণের ক্ষেত্রে দেশের সমুদ্র উপকূলই এই মূহূর্তে সব থেকে আদর্শ জায়গা। শত্রুদেশ হামলার ক্ষেত্রে ডুবোজাহাজও ব্যবহার করতে পারে। তাই, ইদানীং ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী জাহাজ তৈরির উপরে জোর দিয়েছে ভারতীয় নৌসেনা। এই জাহাজগুলির সব ক’টাই তৈরি হচ্ছে গার্ডেনরিচে।

নৌসেনা কর্তাদের একাংশ বলছেন, চিন ইতিমধ্যেই ডুবোজাহাজের সংখ্যায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এ বার চিনের সহায়তায় পাকিস্তানও নয়া প্রযুক্তির ডুবোজাহাজ তৈরির কাজ শুরু করবে। গত অক্টোবরেই এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে ইসলামাবাদ। এই পরিস্থিতিতে গার্ডেনরিচে তৈরি হওয়া ডুবোজাহাজগুলির নকশা এবং অস্ত্র সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড় করলে পাকিস্তান এর মোকাবিলায় নয়া প্রযুক্তির ডুবোজাহাজ তৈরি করতে পারবে। সেই জন্যই গার্ডেনরিচের ভিতরের খবর যোগাড় করা হচ্ছিল বলে গোয়েন্দাদের একাংশ মনে করছেন।

two spies arrested gardenreach ship
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy