Advertisement
E-Paper

এ বার তোড়জোড় আসন ভাগের, জোটের জমি তৈরি শুরু দু’দলের

বাম-কংগ্রেস বোঝাপড়ার প্রস্তাব নিয়ে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি যখন তাদের সম্মতি ঘোষণা করছে, গাড়িতে তখন বহরমপুর ফিরছিলেন তিনি। ফোনে সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের ছাড়পত্রের কথা শুনেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘হ্যাঁ, জোট তো হচ্ছেই! আর কোনও যদি-কিন্তুর ব্যাপার নেই!’’ তার চব্বিশ ঘণ্টা কাটার আগে আজ রাহুল গাঁধীর ঘনিষ্ঠ সূত্রেও বলা হল, ‘‘জোট হয়ে গিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সময়মতো হবে ঠিকই।

শঙ্খদীপ দাস

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৩৮

বাম-কংগ্রেস বোঝাপড়ার প্রস্তাব নিয়ে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি যখন তাদের সম্মতি ঘোষণা করছে, গাড়িতে তখন বহরমপুর ফিরছিলেন তিনি। ফোনে সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের ছাড়পত্রের কথা শুনেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘হ্যাঁ, জোট তো হচ্ছেই! আর কোনও যদি-কিন্তুর ব্যাপার নেই!’’ তার চব্বিশ ঘণ্টা কাটার আগে আজ রাহুল গাঁধীর ঘনিষ্ঠ সূত্রেও বলা হল, ‘‘জোট হয়ে গিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সময়মতো হবে ঠিকই। কিন্তু এখন তা-ও এক প্রকার অপ্রাসঙ্গিক! কারণ, জোট হবে বলে আড়াই মাস আগে থেকে সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলছেন দলের প্রদেশ ও কেন্দ্রীয় নেতারা। নিচু তলায় মানুষের জোটও হয়ে গিয়েছে।’’ এমনকী, আসন বণ্টনের প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস।

বস্তুত, হাইকম্যান্ড ঘোষণা করুক বা না-করুক জোট যে হয়েই গিয়েছে, দুই শিবিরের প্রস্তুতিতেই তা পরিষ্কার। অধীর আজ বলেছেন, ‘‘কংগ্রেসের কাছে হাত তো ছিলই। এখন সেই হাতে হাতুড়িও এসে গিয়েছে! এ বার শাসক দলের উপরে জোরালো ঘা তো পড়বেই! তৃণমূলকে বাংলা ছাড়া করে ছাড়বে মানুষের এই জোট!’’

বাম-কংগ্রেস সমঝোতার ছবি আজ দেখা গিয়েছে অধীরের জেলা মুর্শিদাবাদেই। সেখানে কান্দি পুরসভায় এক নির্দল কাউন্সিলরকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সেই কাউন্সিলরের অনুপস্থিতিতেই আজ কংগ্রেস পরিচালিত পুরবোর্ডের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হয়েছে। একজোট হয়েই এই ‘অগণতান্ত্রিক’ কাজের প্রতিবাদ করেছেন কংগ্রেস ও বাম নেতারা।

আজই সন্ধ্যায় আলিমুদ্দিনে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে ঠিক হয়েছে, জেলায় জেলায় দু’দলের কর্মীদের যথাসম্ভব একসঙ্গে পথে নেমে জনমানসে বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ। তার পরে জেলা ধরে ধরে কোন কোন আসনে কী ভাবে লড়া হবে, ঠিক করবে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী। সিপিএমের এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘আমরাও বলছি, মানুষের জোট হয়ে গিয়েছে। পদ্ধতিগত কাজটা এখন আমাদের সেরে নিতে হবে।’’

বামেদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে তাঁর দলে যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে, তা-ও স্বীকার করে নিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। অধীর জানান, সিপিএম রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে খুব শীঘ্রই আলোচনায় বসা হবে। তার আগে কংগ্রেসের জেলা সভাপতিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, কোন কোন আসনে প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের আগ্রহ রয়েছে।

এক নিঃশ্বাসে অধীর অবশ্য সতর্ক-বাণীও দিয়েছেন, ‘‘কে কোথায় লড়বে, সেই আলোচনা আন্তরিক পরিবেশে হওয়া উচিত। এবং তা যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। যেখানে আমার শক্তি নেই, সেখানেও জোর করে আসন চাইব— তা চলতে পারে না! জেলা নেতৃত্বকে সেই কথাটাও পই পই করে জানিয়ে দিয়েছি।’’ প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্যও বলেছেন, ‘‘কে কটা আসন পেল, সেটা বড় ব্যাপার নয়। বরং খেয়াল রাখতে হবে, সেই আলোচনা যেন সুষ্ঠু ভাবে হয়। যাতে জোটের আবহে কোনও নেতিবাচক আঁচ না পড়ে।’’ রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের মতে, জোটের ব্যাপারে সিপিএম অনেক নমনীয়। কিন্তু অযৌক্তিক ভাবে তার সুযোগ নিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে!

আসন ভাগাভাগির শর্ত তা হলে কী হবে? গত বিধানসভা কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হয়েছিল। তাই সে বারের প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে হিসাব করা যাবে না। তুলনায় গত লোকসভা ভোটে বিধানসভা কেন্দ্রওয়াড়ি উভয়ের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে আলোচনা চলতে পারে। কারণ, তখন চতুর্মুখী লড়াই হয়েছিল। তবে এই শর্ত নিয়েও কংগ্রেসের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। দলের এক নেতার মতে, এতে রায়গঞ্জ তথা উত্তর দিনাজপুরে কংগ্রেসের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

সিপিএম রাজ্য নেতৃত্ব আবার তিন ধরনের আসনের কথা ভেবে রেখেছেন। প্রথমত, কিছু আসন যেখানে বাম বা কংগ্রেস, যে কোনও একটা দলের প্রার্থী থাকবেন। দ্বিতীয়ত, কিছু আসনে বিশিষ্ট বা প্রতিবাদী মুখকে দু’দল সমর্থন দেবে। আর তৃতীয়ত, কিছু আসনে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ হবে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই। যে হেতু আনুষ্ঠানিক জোট করছে না বামেরা, তাই এই কৌশল তাদের নিতেই হবে। জেলায় ঘর গুছিয়ে নিয়েই তার পরে সম্ভবত মার্চের গোড়ায় প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে চূড়ান্ত রফা সেরে নেবে আলিমুদ্দিন।

তার আগে আজ দিল্লিতে তিন বাম শরিক এবং এসইউসি, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিপিএম নেতারা। সেখানে সীতারাম ইয়েচুরিরা ঘরোয়া ভাবে অন্য তিন বাম দলের কাছে কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার বিষয়ে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। বাম শরিকেরাও যে এ বিষয়ে একমত, আজ তার ইঙ্গিত মিলেছে। বৈঠকের পরে সিপিআইয়ের সহকারী সাধারণ সম্পাদক গুরুদাস দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সাহায্য নিতেই হবে।’’ রাজ্যে কংগ্রেস যে অন্যতম গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি তা-ও স্পষ্ট করে দেন তিনি। অন্য শরিকদেরও একই মত।

এখন কৌতূহল, আনুষ্ঠানিক ভাবে বাম-কংগ্রেস বোঝাপড়ার ব্যাপারে কবে সবুজ সঙ্কেত দেন রাহুল গাঁধী? সে ব্যাপারে আন্দাজ পেতে এবং আসন-রফার শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে আজই দিল্লি এসে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সি পি জোশীর সঙ্গে দেখা করেন প্রদীপ ভট্টাচার্য, আব্দুল মান্নান, আবু হাসেম খান চৌধুরী (ডালু), দীপা দাশমুন্সির মতো রাজ্য কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীরা। কংগ্রেসে রাহুল-ঘনিষ্ঠ এক সাধারণ সম্পাদক এ দিন বলেন, ‘‘জোটের ব্যাপারে সহ-সভাপতি অনেক আগেই সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিয়েছেন। বাংলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে পটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে রাহুল তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনিও জানেন প্রস্তাবিত এই জোট নিয়ে তৃণমূল কতটা উৎকণ্ঠায় রয়েছে! রাহুলের মতে, বাম-কংগ্রেস জোট হলে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটের সিংহভাগ তারা পাবে। আবার যাঁরা লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি-কে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এই জোটকে ভোট দেবেন।’’ কংগ্রেসের ওই কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সম্ভবত ২১ বা ২২ তারিখ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও রাজ্য স্তরের নেতারা রাহুলের সঙ্গে দেখা করবেন। তার পরেই হাইকম্যান্ডের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy