দুর্গাপুজো যে আদতে বাঙালির কাছে মেয়ের ঘরে ফেরার উৎসব, তা শুনে ভারী খুশি মাঝবয়সী মার্কিন সাহেব। চশমার ফাঁকে চোখ দু’টো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘‘তাই নাকি? আমিও তো দুই মেয়ের বাবা!’’
বৃহস্পতিবার, পঞ্চমীর বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার ক’টি পুজোমণ্ডপে ঘুরে ঘুরে প্রথমবার দুর্গাপুজোর স্বাদটুকু চাখলেন ডেভিড ডোনাহিউ। আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রকের কনসুলার অ্যাফেয়ার-সংক্রান্ত প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি তিনি। বালিগঞ্জের এক পুজোকর্তার কাছে অসুর-বধের খুঁটিনাটি শুনতে শুনতে বললেন, ‘‘এ তো মেয়েদের ক্ষমতায়নের ব্যাপার!’’ ভারত ও আমেরিকার মধ্যে পর্যটন আঁটোসাঁটো করতে দু’দেশের যৌথ সঙ্কল্পই পুজোর কলকাতায় টেনে এনেছে ডেভিডকে। তিনি বলছিলেন, এ বছরের গোড়ায় আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে পর্যটন-সংক্রান্ত যৌথ বিবৃতির কথা। ‘‘ওবামা ও মোদী ২০১৭ সালটাকে ভারত ও আমেরিকার পর্যটনবর্ষ বলে চিহ্নিত করেছেন। পর্যটন প্রসারে শরিক হিসেবে, দু’দেশই দু’দেশে যাতায়াত বাড়াতে দায়বদ্ধ। আমায় তাই কলকাতায় আসতে হল।’’
কলকাতার যানজটে ঠোক্কর খাওয়ার স্বাদটা অবশ্য খুব ভাল লাগেনি। কিন্তু তা দুর্গোৎসবের মহিমা খাটো করছে না! ডেভিডের কথায়, ‘‘এত আলো-রঙের ছড়াছড়ি ক্যারিবীয় কার্নিভাল বা হংকং-সাংহাইয়ে চিনা নববর্ষে দেখেছি!’’ তাঁর আশা, ‘‘দুর্গাপুজোর নামডাক আরও ছড়ালে আর বিদেশ থেকে আরও লোক এখানে এলে, যানজটের সমস্যা কমবে! পরিকাঠামো আরও ভাল হবে, হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসাও বাড়বে।’’
ভরবিকেলে মনোহরপুকুর রোডে ব্যারিকেডের সামনে ঠাসা ভিড় দেখে তাজ্জব মার্কিন কর্তা। ‘‘বলেন কী, এখনও তো উৎসব শুরুই হয়নি!’’ সন্ধেতেই দুবাই হয়ে ওয়াশিংটন ফেরার বিমান ধরতে হবে ডেভিডকে। বিমানবন্দরে সময়ে পৌঁছনো যাবে কি না, উসখুস করছেন গাড়ির চালক। ডেভিড কিন্তু দিব্যি ফুরফুরে। খান পাঁচেক ঠাকুর হেঁটে ঘুরে ঘুরে না-দেখে থামলেন না তিনি।
ছোটদের কোনও বই ঘেঁটে পুজোর গল্পটা শুনে এসেছিলেন ডেভিড। গণেশকে দেখিয়ে বললেন, ‘‘উনিই আমার সব থেকে পছন্দ!’’ শিবকেও ডেভিড চেনেন। বউ বাপের বাড়ি গেলে, শিব ঝাড়া হাত-পা থাকেন শুনে খুব হাসলেন। ডেভিড ও কলকাতার মার্কিন কনসাল-জেনারেল ক্রেগ হল দু’টি মণ্ডপে ঢাক আর ধামসাও বাজালেন। কোথাও আদিবাসী বিগ্রহ, কোথাও নিমকাঠের ঠাকুর দেখে ডেভিডের চোখেমুখে প্রশংসা, ‘‘এ তো সৃষ্টিশীলতারও প্রতিযোগিতা।’’ আগে বাংলাদেশে কাটিয়েছেন, দিল্লি-কলকাতা এসেছেন, কিন্তু দুর্গাপুজোর কথা শোনেননি। হাল্কা আফশোসেই কলকাতাকে বিদায় জানালেন ডেভিড।