E-Paper

‘বিচারে’র গেরোয় ঝুলে ভোট দেওয়া, ভোটে লড়াও

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন অর্থে সন্দেহজনক এবং বিচারাধীন। বৈধ না অবৈধ, এই সংশয়ে মানুষগুলো ঝুলে থাকছেন। ভোট দেওয়া, ভোটে লড়া সব বিশ বাঁও জলে! অসমের মতো ‘ডি ভোটার’ করার চক্রান্ত এখানে ব্যর্থ করতে হবে।’’

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:২৮

এক পক্ষ ভোট দেয়, আর এক পক্ষ ভোট চায়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ধাক্কায় এই দু’তরফের অধিকারই প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গে! গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক অধিকারে আঘাতে আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়ছে ক্ষোভ।

এই রাজ্যে এসআইআর শুরু হওয়ার আগে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। এসআইআর-এ প্রথমে খসড়া তালিকা এবং পরে চূড়ান্ত তালিকায় সেই সংখ্যা হয়েছে ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪। এই তালিকার মধ্যেই আবার অনিশ্চিত হয়ে ঝুলে রয়েছে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার নাম। কারণ, তাঁরা নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘বিবেচনাধীন’ এবং সেই বিবেচনার ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সব অধিকারই নিলম্বিত! ভোটার বলে স্বীকৃত না-হলে তাঁরা যেমন ভোট দিতে পারবেন না, তেমনই ভোটে প্রার্থী হতেও পারবেন না। ভোটের মুখে কী ভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে নিয়ে এমন টানাটানি করা যায়, সেই প্রশ্ন তুলছে অ-বিজেপি সব মহলই।

এই ‘বিবেচনাধীনে’র আওতায় অন্তত চার জন বিধায়ক রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শশী পাঁজা ও গোলাম রব্বানি রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রীও বটে। বিভিন্ন দলের বেশ কিছু প্রাক্তন বিধায়ক, পঞ্চায়েত ও পুরসভার জনপ্রতিনিধিরাও ‘বিবেচনাধীন’ হয়ে রয়েছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে ফর্ম ৬ পূরণ করে ফের নাম তোলার আবেদন করা যায়। ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সেই সুযোগও নেই। ভোটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এক কংগ্রেস নেতার তাই মন্তব্য, ‘‘প্রার্থী বাছাই করার সময় এখন। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রার্থী-পদে কাউকে বিবেচনার সময়ে দেখতে হবে তিনি ভোটার হিসেবে ‘বিবেচনাধীন’ কি না!’’

রাজ্যের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান বলছেন, ‘‘কোনও দলের হয়ে বা নির্দল হিসেবে ভোটে দাঁড়ানো যে কোনও নাগরিকের অধিকার। এখন বলা হচ্ছে, কোনও ভাবে বাদ গেলে ভোটের পরেও নাম তোলা যাবে। হাস্যকর যুক্তি! আমি যদি প্রার্থী হতে চাই কিন্তু এখন না পাই, নির্বাচনের পরে কি আমার জন্য আবার ভোট হবে?’’ মান্নানের মতে, ‘‘এটা সরাসরি আমাদের অধিকারের উপরে আঘাত। আর মুখ্যমন্ত্রীর করা মামলার পরে বিচার বিভাগ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে যাওয়ায় বিজেপির অমিত শাহেরা এই অন্যায়ে আদালতকে ঢাল করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।’’

মন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মানস ভুঁইয়ার বক্তব্য, ‘‘স্বাধীনতার পরে কখনও এমন পরিস্থিতি হয়নি, এসআইআর-এর নামে যা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে খেলা করছে! ভোট দেওয়া, ভোটে লড়া সব অধিকারই বিপন্ন। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সুরাহা মিলেছে। তবে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার নিষ্পত্তি না-করে ভোট ঘোষণা অনুচিত। রাজ্যের গণতন্ত্রপ্রিয় সব মানুষের এই আওয়াজ তোলা উচিত।’’

কমিশন সূত্রে অবশ্য বলা হচ্ছে, ‘‘বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা কেউই ভোট দিতে পারবেন না, সেটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। যেমন ভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেই অনুযায়ী চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকবে।’’ ওই সূত্রের ইঙ্গিত, ‘বিবেচনা’র পরে বেশ কিছু নাম বাদ পড়তে পারে। আবার অনেক নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে ৬০ লক্ষের ফয়সালা সম্পূর্ণ হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা হচ্ছে না।

ভোট দেওয়া এবং ভোটে লড়া নিয়ে সংশয়ের গেরোয় রাজ্যের নানা অংশের মানুষই পড়েছেন— এমনই দেখা যাচ্ছে কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্য কাটাছেঁড়া করলে। হিসেব বলছে, রাজ্যের প্রায় ১১১টা বিধানসভা কেন্দ্রে গত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ের ব্যবধানের (‘লিড’) চেয়ে এখন ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সংখ্যা বেশি। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে সংখ্যালঘু ভোটার বেশি, এমন ৪১টি কেন্দ্রে বাদ পড়ার হার ৫.৬১%। ‘বিবেচনাধীন’ সেখানে ২১.৪%। এই ৪১ বিধানসভা এলাকার মধ্যে গত লোকসভায় তৃণমূল ২৯টি এবং বাম-কংগ্রেস ১২টিতে এগিয়ে ছিল। এই অংশের প্রতি কেন্দ্রে গড়ে সাড়ে ৫৫ হাজার ভোটার ‘বিবেচনাধীন’। সংখ্যালঘু ভোটার ২০%-এর কম, এমন ১৬০টা বিধানসভা কেন্দ্রে আবার সরাসরি বাদ পড়ার হার তুলনায় বেশি! সেখানে বাদ পড়ার গড় ৮.৪৬%, আর ‘বিবেচনাধীন’ প্রায় ৪%।

উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলার মতুয়া-অধ্যুষিত ১৩টি কেন্দ্রে ‘আনম্যাপড’ অর্থাৎ পুরনো তালিকার সঙ্গে সংযোগহীন ভোটার ছিল ১১.০১%। কেন্দ্র পিছু গড় ধরলে সাড়ে ২৭ হাজারের বেশি ভোটার সংযোগহীন ছিলেন, ‘বিবেচনাধীনে’র ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা সাড়ে ১৬ হাজারের কিছু বেশি। দুইয়ে মিলে আশঙ্কায় রয়েছেন মতুয়াদের বড় অংশ। এরই পাশাপাশি, বিভিন্ন দলের হাতে আসা বুথভিত্তিক তালিকায় দেখা যাচ্ছে, শুনানির নোটিস না-পেলেও পাড়া বা নির্দিষ্ট মহল্লা ধরে এক লপ্তে অনেক নামের উপরে ‘বিবেচনাধীন’ ছাপ পড়েছে চূড়ান্ত তালিকায়!

এমতাবস্থায় সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন অর্থে সন্দেহজনক এবং বিচারাধীন। বৈধ না অবৈধ, এই সংশয়ে মানুষগুলো ঝুলে থাকছেন। ভোট দেওয়া, ভোটে লড়া সব বিশ বাঁও জলে! অসমের মতো ‘ডি ভোটার’ করার চক্রান্ত এখানে ব্যর্থ করতে হবে।’’ তাঁরও আহ্বান, ‘‘বাংলাভাষী এবং বঙ্গবাসীর স্পষ্ট আওয়াজ হোক, তালিকায় বিবেচনাধীন রেখে ভোট ঘোষণা করা যাবে না।’’

সম্মিলিত চাপের মুখে বিজেপি অবশ্য বিষয়টি কমিশনের উপরেই ছেড়ে রাখছে। তবে একই সঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর যুক্তি, ‘‘বিচার বিভাগের আধিকারিকেরা কারও দ্বারা প্রভাবিত না-হয়ে নথি, তথ্য যাচাই করবেন। আর সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীই। এখন কারও নাম বাদ গেলে বা ঝুলে থাকলে জবাবদিহি কালীঘাটে গিয়েই চাওয়া উচিত!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy