প্রাণপণে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন বিবাহিতা মেয়েটি। মুখে গ্যাঁজলা। অটোয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। হঠাৎ অটো থামিয়ে নেমে গেলেন তাঁর শাশুড়ি। তার পরে একই ভাবে পালালেন ভাসুর এবং জা। সব শেষে স্বামীও।
পিছনের অটোয় ছিলেন কয়েক জন প্রতিবেশী। তাঁদের মধ্যে দু’জন, টিয়া মণ্ডল এবং মহম্মদ ফিরোজ জেদ ধরেন, বাঁচাতেই হবে মেয়েটিকে। ২২ বছরের সার্জিনা বিবিকে শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ বারাসত হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁরাই। কিন্তু বিফলে যায় চেষ্টা। বহির্বিভাগে সার্জিনাকে দেখে চিকিৎসকেরা বলে দেন, ‘‘আর কিছু করার নেই।’’
সার্জিনার স্বামী-সহ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সেই থেকে বেপাত্তা। তাঁদের বিরুদ্ধে দত্তপুকুর থানায় পণের জুলুম ও খুনের অভিযোগ দায়ের করেছেন সার্জিনার বাবা মহম্মদ সাহাবুদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, মারধর করে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল সার্জিনাকে। প্রতিবেশীরা গোলমালের শব্দও শুনেছিলেন। শুক্রবার রাতে জামাই ফোন করে তাঁকে বলেছিলেন, সার্জিনার শরীর খারাপ। আসতে বলেছিলেন বারাসত হাসপাতালে। সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘‘হাসপাতালে গিয়ে দেখি, মেয়েটা পড়ে রয়েছে, সাড় নেই। কেউ নেই সেখানে।’’ হাসপাতালের সুপার সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘‘একটু আগে আনা গেলেও বাঁচানোর চেষ্টা করা যেত।’’
দেগঙ্গার চাকলা চাঁদপুর গ্রামের সাহাবুদ্দিনের বড় মেয়ে সার্জিনার সঙ্গে বছর আটেক আগে বিয়ে হয় দত্তপুকুর থানার ছোটজাগুলিয়া মাঠপাড়ার বাসিন্দা ওয়েত আলির ছেলে রাকিবুল ইসলামের। তাঁদের পাঁচ বছরের একটি মেয়েও আছে। সাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, ‘‘জামাই আমের ব্যবসায় নেমেছিল। আমার কাছে তার জন্য টাকা চাইছিল। আমি গরিব মানুষ। বলেছিলাম চেষ্টা করছি। কিন্তু মেয়ের সম্মানে লেগেছিল। ও প্রতিবাদ করে। তাই ওকে মেরেই ফেলে দিল।’’
সার্জিনার আত্মীয় আবুল কালাম বলেন, ‘‘বিয়েতে খাট, বিছানা, আলমারি, মোটরবাইক, চাহিদামতো গয়না দিয়েছিলাম। তার পরেও টাকা চেয়ে মারধর করত। সালিশি সভা বসিয়েও সমাধান মেলেনি।’’ এ দিন ঘটনাস্থলে যান ছোটজাগুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান নুরুল হক। সব জেনেও কেন ব্যবস্থা নেননি, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সংসার করতে চাইত সার্জিনা। কিন্তু ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা চাইত না। আমরা একাধিক বার সতর্ক করেছি।’’ পেশায় চায়ের দোকানদার, সাহাবুদ্দিনের বড় ছেলে নাজিমউদ্দিন জানান, উপার্জিত টাকা প্রায়শই দিদির শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে দিতেন তাঁরা।
প্রতিবেশীরা ভুলতে পারছেন না, হাসপাতালে পাঠাবার পথেও বেঁচে ছিলেন সার্জিনা। স্থানীয় বাসিন্দা মোমিনা বিবি বলেন, ‘‘চিকিৎসা করাবার নাম করে নিয়ে গিয়ে পালিয়ে গেল। মানুষ কী ভাবে এত অমানবিক হয়?’’