Advertisement
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
অডিটে ফাঁস কেলেঙ্কারি

যক্ষ্মা রোখার টাকা কর্মীদের অ্যাকাউন্টে

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এ যেন এক মহা-দুর্নীতির আঁচ! যক্ষ্মা প্রতিরোধের কাজের জন্য কেন্দ্র যে অগ্রিম টাকা এসেছিল, তার অনেকটারই হদিস মিলল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের একাধিক কর্মী-কর্তার ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! যাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে অবসরও নিয়ে ফেলেছেন!

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা শেষ আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৬ ০৩:৫৪
Share: Save:

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এ যেন এক মহা-দুর্নীতির আঁচ! যক্ষ্মা প্রতিরোধের কাজের জন্য কেন্দ্র যে অগ্রিম টাকা এসেছিল, তার অনেকটারই হদিস মিলল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের একাধিক কর্মী-কর্তার ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে! যাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে অবসরও নিয়ে ফেলেছেন!

Advertisement

স্বাস্থ্য ভবন জানাচ্ছে, দফতরের স্ট্যাট্যুটরি অডিট রিপোর্টেই তথ্যটি বেরিয়ে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পরিমার্জিত জাতীয় যক্ষ্মা নিবারণ কর্মসূচিতে (আরএনটিসিপি) কেন্দ্র দশ কোটি টাকা আগাম দিয়েছিল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের যক্ষ্মা নিবারণ বিভাগকে। তার পুরো খরচের হিসেব মিলছে না। কারণ, বেশ কিছু ক্ষেত্রে কাজ শেষের শ‌ংসাপত্র (ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট, সংক্ষেপে ইউসি) জমা হয়নি।

রহস্য খুঁড়তে গিয়েই অনিয়ম ধরা পড়ে। দেখা যায়, টাকার একাংশ যক্ষ্মা নিবারণ বিভাগের কিছু বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মী-অফিসারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মজুত! বস্তুত প্রবীণ স্বাস্থ্য-আধিকারিকেরা ঘটনাটিকে বাম আমলের সেই কেলেঙ্কারির সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে এড্‌স প্রতিরোধের সাড়ে চার কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছিল। স্বাস্থ্য-অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর কথায়, ‘‘সরকারি টাকা কারও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে থাকবে, এমনটা ভাবা যায় না!’’

‘অভাবিত’ বিষয়টি সম্পর্কে গত ২১ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য দফতরের ফিনান্স ম্যানেজমেন্ট সেল। সেলের অধিকর্তা অশোক রায় বলেন, ‘‘যা ঘটেছে, সেটাই অডিট-রিপোর্টে উঠে এসেছে। কর্মসূচির টাকা চেক মারফত কিছু কর্মী ও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। নগদেও গিয়েছে।’’ সকলের নজর এড়িয়ে কী ভাবে গেল?

Advertisement

অশোকবাবু বলেন, ‘‘এর অনুমতি কে দিল, তা তদন্তসাপেক্ষ। কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে। ওরাই যা করার করবে।’’ কেন্দ্র কী বলছে?

তারাও রীতিমতো বিভ্রান্ত। আরএনটিসিপি’র এক অ্যাডিশন্যাল ডিরেক্টর জানাচ্ছেন, ২০১২ থেকে ২০১৬-র মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গকে যক্ষ্মা নিবারণ খাতে আগাম দেওয়া ১০ কোটি ১০ লক্ষ ৮৪৮ টাকার ইউসি মেলেনি। ‘‘বিভাগের লোকজন কেউ ৯৫ হাজার, কেউ ৩৬ হাজার, কেউ ১৬ হাজার কেউ বা ৫৫ হাজার টাকা নিজেদের অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়েছেন। কী ভাবে পারলেন, মাথায় ঢুকছে না।’’— বলেন ওই অফিসার।

রাজ্য যক্ষ্মা-অফিসার শান্তনু হালদারের নামও রয়েছে তালিকায়। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫-য় নেওয়া টাকার ইউসি তিনি জমা দিয়েছেন। কিন্তু বিভাগের অন্য অনেকে দেননি। কেন?

বড় ভুল হয়ে গিয়েছে বলে স্বীকার করেও শান্তনুবাবুর দাবি, এতে উর্ধ্বতনদের সম্মতি ছিল। শুনে স্বাস্থ্য-অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জনবাবুর বক্তব্য, ‘‘আমরা শুধু অগ্রিম নেওয়ার অনুমোদন দিই। টাকা কার নামে কোন অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে, সেটা আমাদের দেখার কথা নয়।’’

অডিট-রিপোর্ট মোতাবেক, যক্ষ্মা বিভাগের অস্থায়ী অ্যাকাউন্ট্যান্ট আশিস রায়ের অ্যাকাউন্টেও কর্মসূচির প্রায় ৪৭ হাজার টাকা গিয়েছে, যার ইউসি নেই। আশিসবাবু এতে
অন্যায় কিছু দেখছেন না। তাঁর যুক্তি, ‘‘কাজের সুবিধার জন্য অনেক সময় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা নেওয়া হয়। জেলার বিভিন্ন কাজে এর অনেকটা খরচ করেছি। জেলা
প্রশাসন সময় মতো ইউসি না-দিলে আমি কী করব?’’

তালিকায় নাম থাকা আরও কয়েক জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। যেমন, স্বাস্থ্য দফতরের তদানীন্তন যুগ্ম অধিকর্তা (পরিবহণ) পার্থসারথি পাল। ওঁর অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯৫ হাজার টাকা গিয়েছে বলে অডিটের দাবি। সদ্য অবসর নেওয়া পার্থবাবু কিন্তু মানতে নারাজ। ‘‘জীবনে কখনও এমন টাকা আমার অ্যাকাউন্টে আসেনি।’’— মন্তব্য তাঁর। দফতরের অবসরপ্রাপ্ত সেক্রেটারিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট কাশীনাথ মিদ্যার (১০ হাজার টাকা) বক্তব্য, ‘‘কিছু মনে পড়ছে না।’’ আর অবসরের পরে পুনর্বহাল চিকিৎসক রামমোহন পারিয়ার (৩৩ হাজার) প্রতিক্রিয়া, ‘‘হতেই পারে না।’’

দফতরের মাথারা কী বলেন?

রাজ্যের স্বাস্থ্য-সচিব রাজেন্দ্র শুক্ল প্রশ্ন শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ‘‘ডিপার্টমেন্টের ঘরোয়া ব্যাপারে আপনারা কেন মাথা ঘামাচ্ছেন?’’— পাল্টা প্রশ্ন ছোড়েন তিনি। সচিবের দাবি, ‘‘আমরাই মিটিয়ে নেব। রাজ্য পরিবারকল্যাণ কমিশনার সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ এটা দেখছেন। দুর্নীতি হয়ে থাকলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।’’

সঙ্ঘমিত্রাদেবী অবশ্য মুখই খুলতে চাননি। ‘‘সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলব না।’’— সাফ কথা তাঁর।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.