Advertisement
E-Paper

ভোররাতে দেহ ফেলে গেল কারা

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য দানা বাঁধল। ভোর রাতে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় যুবক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওই ছাত্রকে রেখে পালায়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:৪১
দরজা ভাঙা, লন্ডভন্ড গোটা মেসবাড়ি।— নিজস্ব চিত্র

দরজা ভাঙা, লন্ডভন্ড গোটা মেসবাড়ি।— নিজস্ব চিত্র

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য দানা বাঁধল। ভোর রাতে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় যুবক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ওই ছাত্রকে রেখে পালায়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

রবিবার বোলপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত ছাত্রের নাম নিশান্ত কিরণ (২১)। আদতে ঝাড়খণ্ডের গিরিডির বাসিন্দা হলেও বর্তমানে তাঁর পরিবার পটনার রুপসপুর থানা এলাকায় বসবাস করে। কলেজ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নিশান্তের বাড়িতে খবর দিয়েছেন। এ দিনই মৃতদেহটি ময়না-তদন্তের জন্য বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কলেজ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ইলামবাজার থানার গোপালনগর এলাকার একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সিভিলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন নিশান্ত। ওই প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু ছাত্র বোলপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জামবুনি এলাকায় মেস করে থাকেন। ওই এলাকাতেই বড় ক্যানাল পাড়ার একটি মেসে আরও চার জনের সঙ্গে থাকতেন নিশান্ত। প্রত্যেকেই একই ক্লাসের ছাত্র। বৃহস্পতিবার তাঁদের পঞ্চম সেমেস্টারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সেই উপলক্ষে শনিবার রাতে মেসেই একটি পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছিল। তার পরেই কোনও ভাবে ওই কলেজ ছাত্রের মৃত্যু ঘটেছে বলে পুলিশের অনুমান।

এ দিন সকালে হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে নিশান্তের দুই মেসমেট সৌরভকুমার সিংহ এবং বরুণ কুমার দাবি করেন, ‘‘রাতে খাওয়াদাওয়ার শেষে আমরা এক জুনিয়রকে বোলপুর স্টেশনে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়েছিলাম। ফিরে দেখি স্থানীয় এক যুবক কাছের মাদ্রাসা পাড়ার একটি মেসের কিছু ছেলেকে নিয়ে আমাদের মেসে ঢুকে পড়েছে। তারা নিশান্তকে মারধর করছে। বাধা দিতে গেলে আমাদেরও মারধর করা হয়। আমরা কোনও রকমে সেখান থেকে ছুটে পালাই।’’ সকালে হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসে তাঁরা নিশান্তের মৃত্যুর খবর পান বলে সৌরভদের দাবি। যদিও কাকে কখন তাঁরা ট্রেনে তুলে দিতে গিয়েছিলেন, হাসপাতালে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা কোথায় ছিলেন, তার জবাব নিশান্তের ওই দুই মেসমেট দেননি। এমনকী, সকাল ৮টার পরেই নিজেদের মোবাইল বন্ধ করে ওই দুই ছাত্র মেস থেকে সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে পালিয়ে যান। খোঁজ মেলেনি মেসের আরও দুই আবাসিক মণীষ এবং সানিরও।

মৃত কলেজ ছাত্র নিশান্ত কিরণ

এ দিন ওই দোতলা ওই মেসে গিয়ে দেখা গেল, সদর গ্রিলের দরজায় তালা ঝুলছে। কিন্তু, কোনও ভাবে হ্যাসবোল্ট বাঁকিয়ে দরজা খোলা হয়েছে। নীচের তলায় পাশাপাশি তিনটি ঘরেরই দরজা ভাঙা। একটি দরজার পাল্লার নীচের অনেকটা অংশ ভেঙে উপড়ে নেওয়া হয়েছে। যততত্র জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। একটি ঘরের কাছে বেশ কিছু এঁটো থালা পড়ে। ঘরের বিভিন্ন অংশে পড়ে একাধিক মদের ভাঙা বোতল। ঘরে থাকা তক্তপোশের এ দিক ও দিকে ছড়িয়ে রয়েছে বইপত্র। দোতলার ঘরে তালা বন্ধ। দোতলায় ওঠা সিঁড়ির কাছে পোড়া খড়ের অংশ। মেসমালিক সুভাষ মণ্ডল থাকেন স্থানীয় বাঁধগোড়ায়। তাঁর ছেলে সুপ্রিয় মণ্ডলের দাবি, ‘‘মাস ছয়েক আগে সৌরভ বাবার সঙ্গে কথা বলে ঘর ভাড়া নিয়েছিল। ওরা পাঁচ জন থাকত জানতাম। তবে, নিশান্তও যে থাকত, তা আমরা জানতাম না।’’ সৌরভদের ফোন পেয়ে তাঁরা ঘটনার কথা জানতে পারেন। কিন্তু, সকালে মেসে এসে তাঁরা কাউকে দেখতে পাননি। মেসের অবস্থা দেখে তাঁরও অনুমান, গভীর রাতে সেখানে তুমুল ভাঙচুর চলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, একই কলেজের ছাত্রে ভর্তি ওই দুই মেসের মধ্যে প্রায় দিনই ঝামেলা লেগে থাকত। ঘটনার রাতেও এলাকার মানুষ সৌরভদের মেস থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়েছেন। ঘটনার পরেই জিনিসপত্র গুটিয়ে পালিয়েছে দ্বিতীয় মেসটির আবাসিকেরাও। দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা মেলে কলেজের মেকানিক্যাল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রের। বইপত্র গুটিয়ে পালানোর আগে তিনি দাবি করেন, ‘‘শনিবার রাতে আমি উদয়ন পল্লিতে অন্য এক বন্ধুর মেসে ছিলাম। কী হয়েছে, কিচ্ছু জানি না।’’ কেন চলে যাচ্ছেন, তার জবাব দেওয়ার আগেই চম্পট দেন বিহারের গয়া এলাকার বাসিন্দা ওই যুবক। এ দিকে, সৌরভদের দাবি, ঘটনার রাতে মাদ্রাসা পাড়ারই বাসিন্দা তথা বোলপুর কলেজের এক ছাত্র ওই মেসের ছাত্রদের নিয়ে এসে তাঁদের মেসে ঢুকে হামলা চালায়। যাঁর দিকে অভিযোগ, সেই ছাত্রের অবশ্য এ দিন কোনও খোঁজ মেলেনি। তাঁর মোবাইল ফোন দিনভর বন্ধ ছিল। বাড়িতে গেলে ভাই নেই বলেই দাবি করেন ওই ছাত্রের দিদি। তবে, কলেজে ডাকাবুকো বলে পরিচিত নিশান্তের সঙ্গে ওই যুবকের সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না বলেই সৌরভদের দাবি।

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে এ দিনই পটনা থেকে রওনা দিয়েছেন নিশান্তের বাবা অশোক শর্মা। ফোনের উল্টো প্রান্ত থেকে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘‘পরীক্ষা দিয়ে আজই ওর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কী ভাবে কী ঘটে গেল কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’’ অন্য দিকে, কলেজের রেজিস্ট্রার অমিতাভ চৌধুরী জানান, পরিবারকে জানিয়ে নিশান্তের মৃত্যুর খবর পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। কলেজের তরফেও ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ দিকে, মৃত ছাত্রের দেহ ময়না-তদন্তে পাঠানো ছাড়া পুলিশ এ দিন ওই ঘটনায় কোনও সক্রিয়তায় দেখায়নি। এমনকী, তারা কোনও মেসেই তদন্তেও যায়নি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy