বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েই ছিল। তাতে দেশলাইকাঠির কাজ করেছে কলকাতা হাই কোর্টের বার কাউন্সিলের নির্বাচন। সেই ভোটে মলয় ঘটকের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট হয়েই তাঁকে আইন দফতর থেকে সরিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তৃণমূল এবং রাজ্য সরকারের অন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, বার কাউন্সিল নির্বাচনের ঘটনা হয়তো মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট আগে থেকেই তৈরি ছিল। যার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে মলয়ের হাতে থাকা শ্রম দফতরের নানা কার্যকলাপ। একই সঙ্গে রয়েছে সংখ্যালঘুদের বিষয়ও। যা আইন দফতরের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
মলয়ের হাতে এখন শুধু পেন্সিলের মতো শ্রম দফতর রয়েছে। যদিও দফতর সূত্রে খবর, ভোটের আগে এই দফতরেও তাঁকে বিশেষ মাথা না-ঘামাতে বলে দেওয়া হয়েছে মৌখিক ভাবে। তবে মলয়ের যে ‘অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ’ রয়েছে, সেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে, তিনি শ্রম এবং আইন— দু’টি দফতরেরই মন্ত্রী। ফেসবুকের পাতায় তা থাকলেও সরকারি নথিতে মলয় আর আইনমন্ত্রী নন। তা হাতে নিয়ে নিয়েছেন মমতা স্বয়ং।
কী কারণে তাঁকে সরানো হল? মলয়কে ফোন করা হলে তিনি বলেন ‘‘নো কমেন্টস।’’ শুধুই কি বার কাউন্সিল নির্বাচন-কেন্দ্রিক অভিযোগ? না কি আরও কিছু রয়েছে? মলয়ের আবার জবাব, ‘‘বললাম যে, এই বিষয়ে নো কমেন্টস!’’ তার পরে ফোন কেটে দেন আসানসোলের এই প্রবীণ নেতা।
আরও পড়ুন:
সূত্রের খবর, বার কাউন্সিল নির্বাচনকে ঘিরে মলয়ের একটি বার্তা মমতার কাছে পৌঁছে যায়। যেখানে তিনি নির্দিষ্ট কয়েক জনকে জেতানোর কথা বলেছেন বলে দাবি তৃণমূলের অনেকের। তৃণমূলের অন্দরে এবং আইন দফতরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে নানা ঘটনার কথা। শ্রম দফতর থেকেও মলয়কে ঘিরে প্রলয় ঘটার মতোই একাধিক ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। শ্রম দফতরে মলয়ের কাজ নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই তৃণমূলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষত সেই আলোচনা জোরালো হয়েছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনতে রাজ্য সরকার যে প্রকল্প চালু করেছিল, তা ‘সঠিক’ ভাবে বাস্তবায়িত না-হওয়ায়। গত ফেব্রুয়ারিতে চা-বাগান সংক্রান্ত একটি ঘটনা নিয়েও অসন্তোষের কথা নবান্ন পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে খবর। উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলিতে রাজ্য সরকার যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি গড়ে তুলেছে, সেগুলি ইএসআইয়ের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ইএসআই মানেই কেন্দ্রীয় সরকার। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের চালু করা শ্রমকোডের বিরোধিতাই করেছে তৃণমূল। ঘুরপথে তা-ও কার্যকর করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল বলে অভিযোগ। তৃণমূলের চা বাগান শ্রমিকদের ইউনিয়নও বিরোধিতা করে চিঠি দেয় মন্ত্রীকে।
সেখানেই শেষ নয়। তৃণমূল, সিপিএমের ইউনিয়ন বিরোধিতা করলেও শ্রম দফতরের তরফে সব ট্রেড ইউনিয়নের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে লেখা হয়, সব পক্ষ সমর্থন জানিয়েছে। সেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরে তৃণমূলের চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বীরেন্দ্র বরা ওঁরাও আবার চিঠি দেন মলয়কে। আবার বিজেপি অনুমোদিত চা শ্রমিক ইউনিয়ন ইএসআইয়ের প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন মন্ত্রী মলয়কে। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ পাঠানো সেই চিঠিতে সই রয়েছে বিজেপির চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রাজেশ বার্লার। সেই সমস্ত নথি আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে রয়েছে। সূত্রের এ-ও খবর যে, তৃণমূলের এক প্রতিনিধি সরকারি বৈঠকেই বলেছিলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের শ্রম দফতর বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে চলছে কি না সেটাই বোঝা যাচ্ছে না!’’
বিষয়টি নবান্নের নজরে আসার পরে তা থামাতে বাধ্য হতে হয় শ্রম দফতরকে। এর মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে। আইন বিভাগের যে শাখা মহাকরণ (রাইটার্স বিল্ডিং) থেকে কাজ করে, তারাই এই নিয়োগ তদারকি করে। রেজিস্ট্রার হতে চেয়ে যাঁরা আবেদন করেন, তাঁদের যোগ্যতা পরীক্ষা করা হয়। তার পরে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেখানেও প্রথা মেনে সব হয়নি বলে কারও কারও অভিযোগ। যা ক্ষোভের সঞ্চার ঘটিয়েছে। বিধানসভা ভোটের আগে নানা কারণেই এ বার সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের জন্য ‘স্পর্শকাতর’। সেখানে এ হেন ঘটনায় দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বিরক্ত বলে খবর।
ঘটনা আছে আরও। তৃণমূলের আইন শাখা সাংগঠনিক ভাবে নিলম্বিত করেছিল, এমন এক নেতার সঙ্গে মলয় নৈকট্য রেখে দিয়েছেন বলে দলের নেতৃত্বের কাছে খবর পৌঁছেছে। সূত্রের এ-ও খবর যে, ওই তথ্য মমতার কাছে পৌঁছে দেন দলের এক প্রথম সারির নেত্রী। ওই নিলম্বিত নেতাকে শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদ থেকেও সরানো হয়নি বলে অভিযোগ।
তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, মলয়কে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বার উষ্মাপ্রকাশ করেছেন মমতা। অম্বেডকর মূর্তির সামনে মমতা যখন ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ধর্নায় বসেছিলেন, তখনও নেতাদের সামনে মলয়কে ভর্ৎসনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, লোকসভা ভোটের পরে কার্যত হাটের মাঝে মলয় সম্পর্কে মমতার উক্তি ছিল, ‘‘এত চেষ্টা করেও মলয় আসানসোলে বিজেপি-কে জেতাতে পারল না!’’
সময়ের নিরিখে মলয়ের হাত থেকে আইন দফতর নিয়ে নেওয়াকে তৃণমূলের প্রথম সারির নেতারা তো বটেই, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকেরাও ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোট ঘোষণার দিন কয়েক আগে এই সিদ্ধান্ত আসলে মলয়কে সোজাসাপটা ‘বার্তা’। সেই সূত্রেই মলয়ের বিধানসভা ভোটে টিকিট পাওয়া নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রার্থী করা হলেও তাঁকে তাঁর পুরনো আসনেই (আসানসোল উত্তর) প্রার্থী করা হবে, না কি বিজেপির দখলে থাকা পশ্চিম বর্ধমানের কোনও আসনে টিকিট দেওয়া হবে, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে তৃণমূলে।