Advertisement
E-Paper

দেওয়া টাকা কি কেটে নেবে রাজ্য, কাঁটা শিক্ষকেরা

প্রসঙ্গ এইচআরএ এত দিন নিয়ম ছিল এক রকম। আচমকা তা পাল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে, যার নেপথ্যের যুক্তি বিশেষ স্পষ্ট নয়। তা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন উঠলেও সন্তোষজনক জবাব এখনও নেই।

নিজস্ব সংবাদাদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৬ ০৪:২১

প্রসঙ্গ এইচআরএ এত দিন নিয়ম ছিল এক রকম। আচমকা তা পাল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে, যার নেপথ্যের যুক্তি বিশেষ স্পষ্ট নয়। তা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন উঠলেও সন্তোষজনক জবাব এখনও নেই। সব মিলিয়ে রাজ্যের স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে আশঙ্কা ও বিভ্রান্তি চরমে।

এবং যে বিষয়টিকে ঘিরে এত শোরগোল, তা হল বাড়িভাড়া-ভাতা (হাউস রেন্ট অ্যালাওয়েন্স, সংক্ষেপে এইচআরএ)। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের কোনও কর্মীর স্বামী বা স্ত্রীও রাজ্য সরকারি কর্মচারী হলে দু’জনে মিলে বাড়িভাড়া বাবদ সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পাবেন। আধা সরকারি সংস্থার কর্মী, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। তবে এঁদের কারও স্বামী বা স্ত্রী বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত হলে এই নিয়ম খাটার কথা নয়।

কিন্তু কথা না-থাকলেও এখন সে রকমই তো়ড়জোড় চলছে, যার মধ্যে মোটা আর্থিক ক্ষতির সিঁদুরে মেঘ দেখছে শিক্ষকমহল। শিক্ষা দফতরের খবর: সম্প্রতি অডিটর জেনারেলের অফিস থেকে নানা কলেজে অডিট টিম গিয়েছিল। তারাই জানিয়ে এসেছে, স্বামী বা স্ত্রী বেসরকারি সংস্থায় কাজ করলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষিকার এইচআরএ-তে ছ’হাজারি লাগাম পড়বে। শুধু তা-ই নয়, এমন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা বাড়িভাড়া বাবদ ‘অতিরিক্ত’ টাকা পেয়ে গিয়েছেন বলে জানিয়ে অডিটরেরা তাঁদের বাড়তি অর্থ ফেরানোর ফরমানও জারি করে এসেছেন।

স্বভাবতই জোর গুঞ্জন। স্বামী বা স্ত্রী বেসরকারি কর্মী— এমন বহু শিক্ষক-শিক্ষিকার আশঙ্কা, এ বার তাঁদের থেকে ভাল পরিমাণ টাকা সরকার কেটে নেবে। একেই বিস্তর ডিএ বকেয়া। তার উপরে এই বাড়তি বোঝা চাপার সম্ভাবনায় শিক্ষকমহল যারপরনাই ক্ষুব্ধ। হঠাৎ এ হেন ফরমান কেন?

বস্তুত এর শিকড় লুকিয়ে রয়েছে অর্থ দফতরের চার বছর পুরনো এক বিজ্ঞপ্তিতে। ২০১২-য় জারি করা বিজ্ঞপ্তিটিতে বলা হয়েছিল— শিক্ষক বা শিক্ষিকার স্বামী বা স্ত্রী বেসরকারি চাকরি করলেও দু’জনের এইচআরএ ৬ হাজারের গণ্ডি ছাড়াতে পারবে না। বেশি দেওয়া হয়ে থাকলে বাড়তি টাকাটা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষিকার থেকেই কেটে নেওয়া হবে, কারণ বেসরকারি সংস্থার এইচআরএ’তে সরকার রাশ দিতে পারে না।

বিজ্ঞপ্তি ঘিরে সে সময় শিক্ষকমহলে তো বটেই, শিক্ষা দফতরের অন্দরেও প্রবল সংশয় ও বিতর্ক দানা বাঁধে। প্রশ্ন ওঠে, বেসরকারি চাকুরের বাড়িভাড়া জোগানোর দায় যখন সরকারের নেই, তখন এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত? বিতর্কের মুখে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, টাকা কাটার প্রশ্ন নেই। শিক্ষা দফতর বিষয়টি নিয়ে অর্থ দফতরের সঙ্গে আলোচনায় বসবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন মন্ত্রী।

ব্যাপারটা এত দিন ওখানে থেমে ছিল। টাকা কাটা হয়নি। কিন্তু অডিটের লোকজন হঠাৎ অর্থ দফতরের পুরনো আদেশনামাটিকে আবার সামনে নিয়ে এসে টাকা ফেরতের কথা বলায় তুমুল বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অডিটের তরফে এ রকম ‘ফরমান’ জারির এক্তিয়ার আছে কিনা, সে প্রশ্নও জোরদার। শিক্ষামন্ত্রীর কী বক্তব্য?

পার্থবাবু অবশ্য এ বারও আশ্বস্ত করছেন। ‘‘টাকা কাটার সম্ভাবনা নেই। অর্থ দফতরের নির্দেশিকার জেরে এই পরিস্থিতি। শিক্ষা দফতর থেকে অর্থ দফতরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।’’— বলছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস, ‘‘কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকাকে এইচআরএ ফেরাতে হবে না। সরকার কারও টাকা কাটবে না। অডিটের নোট এলে দফতরই জবাব দেবে।’’ তা হলে সংশয়ে দাঁড়ি টেনে সরকার কেন বিজ্ঞপ্তি জারি করছে না?

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সেই কাজটা অর্থ দফতরকে করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আতঙ্কিত না-হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন পার্থবাবু।

ঘটনা হল, ২০১২-র ওই আদেশনামা চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে কয়েক জন শিক্ষিকার তরফে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও হয়েছে, যার ভিত্তিতে আদালত নির্দেশিকায় স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আইনজীবী এক্রামুল বারি জানাচ্ছেন, দু’টি আলাদা মামলায় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্ত পুজোর আগে নির্দেশ দেন, এইচআরএ বাড়তি দেওয়া হয়েছে— এই যুক্তিতে কোনও সরকারি কর্মীর বেতন থেকে সরকার টাকা কাটতে পারবে না। অন্য এক মামলায় গত ডিসেম্বরে বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশ— নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এইচআরএ সংক্রান্ত সরকারি আদেশনামায় স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকবে। ‘‘স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে রাজ্য আপিলে যায়নি। তাই স্কুল-কলেজে এইচআরএ’র টাকা কাটা হচ্ছে না। এখন অডিটে টাকা কাটার কথা থাকলে অর্থ দফতরের কাছে আমরা ব্যাখ্যা চাইব।’’— বলছেন এক শিক্ষা-কর্তা।

কিন্তু অর্থ দফতর খামোকা এমন বিজ্ঞপ্তি জারি করতে গেল কেন?

এক শীর্ষ অর্থ-কর্তার যুক্তি, ‘‘সরকারি বা বেসরকারি, চাকরি যা-ই হোক না কেন, স্বামী-স্ত্রী এক বা়ড়িতে থাকলে দু’জায়গা থেকে বাড়িভাড়ার টাকা নেওয়া যায় না। তাই নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল।’’

তবে শিক্ষা দফতর আলোচনা চাইলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন ওই অর্থ-কর্তা। যদিও অর্থ দফতরের ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট আদেশনামাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে বিভ্রান্তি বেড়েছে বই কমেনি। তবে শিক্ষামন্ত্রীর সুরে তাঁর দফতরের একাধিক অফিসারও ভরসা দিচ্ছেন। বলছেন, নিছক অডিটরের কথার ভিত্তিতে টাকা কাটা হবে না। অর্থ ও শিক্ষা দফতর এক সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবে।

‘‘তার আগে অযথা আতঙ্কের কারণ নেই।’’— মন্তব্য এক শিক্ষা-আধিকারিকের।

teachers state government
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy