কিছুটা রসিকতার সুরেই বামফ্রন্ট সরকারের এক প্রাক্তন মন্ত্রীকে বলেছিলেন কংগ্রেসের এক বিধায়ক, ‘‘আপনারা তো বুঝতে পারছিলেন ২০১১ সালে আর ফিরবেন না। যাওয়ার আগে এই রকম আইনগুলো রেখে গেলেন কেন? নানা রকম ফাঁকফোকর খুঁজে তৃণমূলের সরকার তা হলে এত ব্যভিচার করে বেড়াতে পারত না!’’
তখন যা ছিল রসিকতা, এখন সেটাই নিষ্ঠুর বাস্তব! বাম জমানায় প্রণয়ন করে যাওয়া নানা আইনের দুর্বল, অযৌক্তিক ধারা-উপধারা ব্যবহার করে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। একের পর এক স্বশাসিত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বলে এখন সরব বামেরাই। অথচ বামেদেরই রেখে যাওয়া অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বেপরোয়া হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা! যে অস্ত্রের আঘাতে নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্ধ বামেরাও! যা দেখে নাগরিক সমাজের একাংশে চর্চা চলছে, এখন হাহাকার করে হবে কী! এমন অনাচারের রাস্তা তো খুলে দিয়ে গিয়েছে বামেরাই। নিজেদের জমানায় সে সব আইন প্রয়োগ করে উঠতে না পারলেও বাম শাসনের নেপথ্য দর্শন এই বিধি থেকেই স্পষ্ট!
এই করুণ কাহিনি থেকে শিক্ষা নিয়েই আলিমুদ্দিন মনস্থ করেছে নিজেদের পাপের ভবিষ্যতে প্রায়শ্চিত্ত করার! বাম এবং মমতা জমানার একগুচ্ছ আইন পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে সংশোধন করার নীতিগত ভাবনা ভেবে ফেলেছে তারা। শর্ত— অবশ্যই ফের সরকারে ফিরলে।
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী প্রধান পদে রাজ্যের পরিবহণ সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়োগ ঘিরে বির্তক এখন তুঙ্গে। মামলা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনে অস্থায়ী দায়িত্ব নেওয়ার পরে আলাপনবাবু অবশ্য পরিবহণ সচিবের পদ থেকে আপাতত অব্যাহতি নিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কোনও ব্যক্তিকে বসানো আদৌ যে নৈতিকতার নিরিখে গ্রহণযোগ্য নয়, সেই প্রশ্নই এখন জোরালো। বিতর্কের মুখে ঢাল হিসাবে রাজ্য সরকার ব্যবহার করছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন আইনের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ২ নম্বর ধারাকে। যেখানে নির্বাচন কমিশনার হঠাৎ ইস্তফা দিলে, পদত্যাগ করলে, অসুস্থ হয়ে পড়লে বা প্রয়াত হলে কর্মরত আমলাকে অস্থায়ী দায়িত্বে নিয়োগ করার সংস্থান বিধিবদ্ধ আছে! এবং এই সংস্থান রেখে দিয়ে গিয়েছিল বাম জমানার আইনই!
মমতা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠলেও বামেদের দিকেই প্রশ্ন ব্যুমেরাং হয়ে আসছে, কেন তারা এমন অনৈতিক, অযৌক্তিক আইনের ধারা রাখতে গেল? ঘটনা যে, ওই ধারা ব্যবহার করার পরিস্থিতি বাম জমানায় তৈরি হয়নি। তবু নীতিগত ভাবে এমন অন্যায়ের ক্ষেত্রপ্রস্তুত করার দায় তাদের ঘাড়েই চাপছে। কোনও কোনও মহল থেকে এমনও বলা হচ্ছে, সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করেই যে হেতু তাকে অন্তর্ঘাত করতে চাওয়ার তাত্ত্বিক লক্ষ্য নিয়ে বামেদের পথ চলা শুরু হয়েছিল, এমন সব বিপজ্জনক আইনি সংস্থান সেই উদ্দেশ্য থেকেই রচিত হয়ে থাকতে পারে!
এমন সমালোচনা ও অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই এ বার সিপিএম শীর্ষ নেতৃত্বের উপলব্ধি, পুরনো ভুল ভবিষ্যতে শুধরে নিতে হবে। দলের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের কথায়, ‘‘ন্যাড়া বেলতলায় কত বার যায়! যখন এ সব আইন হয়েছিল, কে জানত একটা স্বৈরাচারী সরকারের হাতে পড়ে এগুলো এমন মারাত্মক চেহারা নেবে! শুধু নির্বাচন কমিশন আইন নয়, আরও কিছু আইন চিহ্নিত করে আমাদের সংশোধন করতে হবে। একই ভুল তো বারবার করা যায় না!’’ এই কাজের জন্য আইনজ্ঞদের ডেকে পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে আলিমুদ্দিনের। আইনজীবী এবং বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার হাসিম আব্দুল হালিম যেমন ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত পরামর্শ দিচ্ছেন।
রাজ্য নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত যে আইনটিকে ঘিরে এখন এত বিতর্ক, রাজ্য বিধানসভায় তার গেজে়ট বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল ১৯৯৪ সালের ২২ মার্চ। জ্যোতি বসু তখন মুখ্যমন্ত্রী, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক শৈলেন দাশগুপ্ত। আলিমুদ্দিনের নীতি নির্ণায়ক ভূমিকায় তখন রয়েছেন অনিল বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুরাও। সংবিধানের ৭২ ও ৭৩তম সংশোধনীর পরে প্রতিটি রাজ্যেই নির্বাচন কমিশন গড়ার প্রয়োজন হয়েছিল। বাম সরকার আইন পাশ করে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদ তৈরি করেছিল ঠিকই। কিন্তু রাজ্য সরকারের সঙ্গে ‘পরামর্শ’ করে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ও ভোটে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে কমিশনকে, এই সংস্থান রেখে কমিশনের স্বাধিকার গণ্ডিতে বেঁধে ফেলাও হয়েছিল! অর্থাৎ কমিশন তাঁরা গড়লেন কিন্তু কলকাঠি নাড়ার ক্ষমতা রয়ে গেল নিজেদের হাতে! আইনের ওই সংস্থানের ব্যাখ্যা চাইতে মমতা জমানায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল প্রাক্তন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পাণ্ডেকে। ওই আইনেই বলা হয়েছিল, হঠাৎ কোনও কারণে কমিশনার সরে গেলে অস্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে কর্মরত আমলাকে। বাম সূত্রের বক্তব্য, যে কোনও পদেই আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসাবে বিকল্পের বন্দোবস্ত রাখতে হয়। রাজ্যপাল সরলে যেমন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী ভাবে কাজ চালান। এই আইনও সে ভাবেই ভাবা হয়েছিল। শুধু জানা ছিল না, ২১ বছর পরে এক দিন সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায় এমন নাটকীয় পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করবেন আর ওই আইনের ফাঁক দিয়েই আলাপনের হাত ধরে কমিশনে ঢুকে পড়বে রাজ্য সরকার!
বাম জমানায় অবশ্য অবসরপ্রাপ্ত মুখ্যসচিব, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব বা অবসরের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো আধিকারিকেরা রাজ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন। অস্থায়ী দায়িত্বে কেউ আসেননি। তবু ভুলের ক্ষত দগদগ করছে আইনের ছত্রে ছত্রেই! ঠেকে শিখে এখন ভুল কবুল করেই নিচ্ছেন সিপিএম নেতৃত্ব। সেলিমের মন্তব্য, ‘‘জরুরি অবস্থা জারি করার সংস্থানও তো আইনে ছিল। তাই বলে কি সেটা কাঙ্খিত? জরুরি অবস্থার পরে অনেক আইন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়েছিল। সরকারে ফিরলে আমাদেরও তা-ই করতে হবে।’’
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবু মনে করেন, ‘অনিলায়নে’র অমোঘ ছাপ রেখে যাওয়া শিক্ষা সংক্রান্ত কিছু আইনও জনমানসে তাঁদের ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে। রাজনৈতিক ভাবে তাঁরা সেই ভুল মানছেন। চাইছেন সে সব আইন ফেলা হোক আইনি আতস কাচের তলাতেও। মমতা জমানায় ‘গুরুমারা বিদ্যা’র রমরমা দেখে ভবিষ্যতে প্রায়শ্চিত্তের জন্যই তৈরি হচ্ছেন বুদ্ধবাবুরা! যদি ইতিহাস সুযোগ দেয় তো!