Advertisement
E-Paper

জোট মানে তৃণমূল গায়েব, বলছে অঙ্ক

অধীর চৌধুরী মরিয়া হয়ে জোট চাইছিলেন। মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য চাইছিলেন না। বৃহস্পতিবার এ কে গোপালন ভবনে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের শেষে প্রথম জন চওড়া হাসি হাসছেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৫৩

অধীর চৌধুরী মরিয়া হয়ে জোট চাইছিলেন। মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য চাইছিলেন না।

বৃহস্পতিবার এ কে গোপালন ভবনে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের শেষে প্রথম জন চওড়া হাসি হাসছেন। তবে, দ্বিতীয় জন এখনই স্রোতে গা ভাসাতে নারাজ। বলছেন, জোট হবে না আসন সমঝোতা, তার কিছুই এখনও পরিষ্কার নয়। এখনই কিছু বলার সময় আসেনি।

এই দু’জনের বাইরে ছিলেন আরও এক জন। দলনেত্রীর ঢঙে তিনিও কংগ্রেস-সিপিএমের জোট-জল্পনাকে প্রথম থেকেই প্রকাশ্যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এসেছেন। এ দিন সেই মান্নান হোসেনের মুখ কিছুটা শুকিয়েছে। যদিও এখনও বুক ঠুকে তিনি বলে চলেছেন, ভোটারদের সঙ্গেই তাঁদের জোট রয়েছে। তাঁরাই জিতবেন।

প্রথমেই একটা কথা বুঝে নেওয়া ভাল যে, সাংগঠনিক শক্তির বিচারে তৃণমূল মুর্শিদাবাদে তৃতীয় শক্তি। গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বিচারেও। ওই দুই ভোটেই মাত্র একটি আসনে তারা বাকি বাম ও তৃণমূলের চেয়ে সামান্য এগিয়ে ছিল, সেটি সাগরদিঘি। যদিও সেটুকুও তারা এ বার ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে দলেই একটি মহলের সন্দেহ রয়েছে।

জেলার মোট ২২টি আসনের মধ্যে বাকি ১৪টি বিধানসভা আসন জিতেছিল কংগ্রেস, সাতটি বামেরা। তৃণমূল পরে সুতিতে কংগ্রেস বিধায়ক ইমানি বিশ্বাস এবং ভগবানগোলায় সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক চাঁদ মহম্মদকে ভাঙিয়ে নেয়। কিন্তু ওই দুই নেতার পিছু-পিছু ভোটারেরাও যে দল পাল্টে ফেলেননি, তার প্রমাণ ২০১৪ লোকসভা ভোটে সুতিতে সেই কংগ্রেস এবং ভগবানগোলায় সেই বামেরাই এগিয়ে ছিল। ওই ভোটে সমীকরণ ঈষৎ পাল্টে কংগ্রেস ১৬টি আসনে এবং বামেরা পাঁচটি আসনে এগিয়ে ছিল। একাই ৪০% ভোট পায় কংগ্রেস। বামেরা ২৯%, তৃণমূল সেখানে মোটে ১৯%।

তা হলে, অধীর কেন এত মরিয়া হয়ে জোটের জন্য সওয়াল করছেন?

প্রথমত, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে অধীরকে জেলার পাশাপাশি গোটা রাজ্যের ভোট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। মুর্শিদাবাদ ছাড়া অন্য কোথাওই কংগ্রেসের এত শক্তি নেই।

দ্বিতীয়ত, মুর্শিদাবাদেও পরিস্থিতি কিছুটা বদলে গিয়েছে গত দেড় বছরে। প্রথমে জেলা সভাপতি পদে পোড়-খাওয়া মান্নান হোসেনকে আনা এবং তার পরে জেলার পর্যবেক্ষকের পদ থেকে গায়ক ইন্দ্রনীল সেনক‌ে সরিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে পাঠানো, এই দুই মোক্ষম চালে অধীর শিবিরে অনেকটাই কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। একে তো আবাল্য কংগ্রেসী রাজনীতি করে আসা মান্নান এই জেলা ও তার কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক হাতের তালুর মতো চেনেন। তার উপরে শুভেন্দুর মতো হেভিওয়েট নেতার আসা-যাওয়া তৃণমূলের পালে অনেকটাই হাওয়া জুগিয়েছে।

ফল ফলেছে হাতে-নাতে। বড়ঞা, ভরতপুর, খড়গ্রামের মতো বেশ কিছু এলাকায় তৃণমূল শক্তি বাড়িয়েছে। ভয়ে হোক বা ভক্তিতে, ক্ষমতার সঙ্গে থাকা বা অন্য কোনও প্রলোভনে শাসকদলের দিকে পা বাড়িয়েছেন কংগ্রেসের কিছু নেতাকর্মী। কিছু দিন আগেই ধুলিয়ান পুরসভা কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়েছিল। এখন একই রাস্তায় হাঁটছে কান্দি পুরসভাও। বেলডাঙা এবং বহরমপুর পুরসভা নিয়েও একই রকম আশঙ্কায় ভুগছেন কংগ্রেস নেতারা। বামেদের ক্ষতি সেই তুলনায় এখনও কম। কিন্তু তৃণমূলের বাড়বাড়ন্ত আটকাতে না পারলে যে রক্তক্ষরণ থামানো যাবে না, তা দুই দলের বহু নেতাই বুঝছেন।

এ দিন সিপিএম সমঝোতার রাস্তা খোলার পরে জেলার বাম ও কংগ্রেস নেতাদের বড় অংশই স্বস্তিতে। তবে তার চেয়েও বেশি উল্লসিত দুই দলের নিচুতলার কর্মীরা। জোট না হলেও যে তৃণমূলের আসন বাড়ত, এমনটা কেউ মনে করছেন না। কিন্তু নিজের নাক কেটে কংগ্রেসের যাত্রাভঙ্গ করত তৃণমূল, তাতে সন্দেহ নেই। খড়গ্রাম, জঙ্গিপুর, সুতি, ভরতপুর, বড়ঞা এবং হুমায়ুন কবীরের রেজিনগরে বামেরা তাতে সুবিধা পেয়ে যেত। হয়তো জিতেও যেত। আসন সমঝোতা হলে সেই ঝুঁকি এড়ানো যাবে। তা সত্ত্বেও যে বামেদের একটা বড় অংশ খুশি, তার কারণ শাসক তৃণমূলকে তারা কংগ্রেসের চেয়ে অনেক বড় বিপদ বলে মনে করছেন।

ঠিক যেমনটা মনে করছেন বেশির ভাগ কংগ্রেস নেতাকর্মীরা। এমনকী যাঁরা দীর্ঘদিন বামেদের বিরুদ্ধে লড়ে এসেছেন, মার খেয়েছেন, পাল্টা মার দিয়েছেন, তাঁরাও মনে করছেন, এই সন্ধিটা জরুরি। গত কিছু দিনে জেলা জুড়ে যত জোট-জল্পনা হয়েছে, তাতে মোদ্দা একটা কথাই উঠে এসেছে। তা হল, বাম জমানার চেয়েও এখন বেশি সন্ত্রস্ত এবং অপমানিত বোধ করছেন কংগ্রেস কর্মীরা। শুধু নিচুতলা নয়। তৃণমূলের ইঙ্গিতে জেলা প্রশাসন যে ভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় অগ্রাহ্য করছে, কংগ্রেস পরিচালিত জেলা পরিষদকে যে ভাবে কার্যত ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে, তা সিপিএম আমলেও হয়নি বলে অভিযোগ করছেন বর্যীয়ান নেতারা।

গত লোকসভা ভোটের হিসেব বলছে, জেলায় কংগ্রেস ও বামেদের মিলিত ভোট ছিল ৬৯% ভোট। দুই দলের কিছু সমর্থক যদি আদর্শগত দোলাচলে ভুগে ভো‌ট না-ও দেন, তা হলেও এর থেকে কতটাই বা কমতে পারে? ১৯% থেকে কতটা বাড়তে পারে তৃণমূলের ভোট? সংখ্যালঘু প্রধান এই জেলায় বিজেপি কোনও দিনই কোনও ফ্যাক্টর ছিল না, এখনও নয়। অর্থাৎ অঙ্কটা খুব পরিষ্কার। জোট হলে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে তৃণমূল। ২২টি আসনই নেবে জোট।

এই পরিস্থিতিতেই এখন দিল্লির দিকে চেয়ে আছে গোটা মুর্শিদাবাদ। ১০ জনপথ থেকে এখনও সবুজ সঙ্কেত আসেনি। যদিও ‘নিচুতলায় মানুষের জোট হয়ে গিয়েছে’ বলে ইতিমধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন অধীর।

দিল্লিতে কংগ্রেসের হাইকমান্ড সেই দেওয়াল-লিখন পড়তে পারে কি না, সেই দিকেই এখন তাকিয়ে দুই দলের নিচুতলা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy