সরকারি খয়রাতির ঠেলায় রাজ্যের ক্লাবগুলিও এসে পড়ল নির্বাচন কমিশনের আতসকাচে। কারণ বিরোধীদের অভিযোগ, আমজনতার দেওয়া করের টাকাই ঘুরপথে শাসক দলের হয়ে ভোটের কাজে খাটছে।
কী রকম? হাওড়ার উলুবেড়িয়া (উত্তর) বিধানসভা এলাকায় কাছাকাছি দু’টো ক্লাবকে ধরা যাক। ভোটের বাজারে একটির উপরে জোড়াফুল আঁকা শাড়ি সরবরাহের ভার বর্তেছে। অন্যটি জোগাবে হাফহাতা পাঞ্জাবি। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের কড়া নির্দেশ, ২৫ মার্চের মধ্যে ‘মাল’ পৌঁছে দিতে হবে দলের নির্বাচনী অফিসে। আবার সাঁকরাইলের এক ক্লাবের দায়িত্ব একশো গ্লুকোজ-প্যাকেট তৈরি রাখার। রোদে ঘেমে-নেয়ে মিছিল করার পরে শাসক দলের কর্মী-সমর্থকেরা যাতে গলা ভিজিয়ে একটু ঠান্ডা হতে পারেন।
কিন্তু ক্লাব টাকা কোথায় পাবে? ‘‘সরকারের কাছ থেকে যে টাকা অনুদান পেয়েছি, সেখান থেকে ভাগ্যিস পঁচিশ হাজার সরিয়ে রেখেছিলাম। তাই দিয়ে খরচ মেটাব,’’ বলছেন সাঁকরাইলের এক ক্লাবকর্তা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে বিরোধীদের অভিযোগও ঠিক এমনই। কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম— সকলের দাবি, সরকার আদতে ভোটের কথা মাথায় রেখেই গত পাঁচ বছর ধরে রাজকোষ থেকে কোটি কোটি টাকা হাজারো ক্লাবকে বিলিয়েছে। সরকারি দাক্ষিণ্যপ্রাপ্ত সেই সব ক্লাবকে শাসক দল এখন ভোটের কাজে লাগাচ্ছে। এবং বিরোধী অভিযোগকে কার্যত মান্যতা দিয়ে মঙ্গলবার কলকাতায় কমিশনের ফুল বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি অনুদান পাওয়া সমস্ত ক্লাবের কাজকর্মে ভোট-পর্যবেক্ষকেরা কড়া নজর রাখবেন। যা শুনে বিরোধী পক্ষের দাবি: অনুদানপ্রাপ্ত ক্লাবগুলোর খরচের হিসেব-নিকেশও কমিশন যাচাই করুক। তা হলেই ‘লেনদেনের কিস্সা’ পরিষ্কার হয়ে যাবে।
নবান্ন-সূত্রের খবর: ২০১২ সালে প্রথম বার ৭৮১টি ক্লাবের পিছনে সাড়ে পনেরো কোটি টাকা ঢালা হয়েছিল। ২০১৩ সালে দাতব্যের বহর দাঁড়ায় চল্লিশ কোটিতে। বরাদ্দের অঙ্ক প্রথম বছর ক্লাবপিছু দু’লাখ, পরের চার বছর এক লাখ। ২০১৩ সালে দু’হাজার ক্লাব অনুদান পায়। কোষাগার থেকে বেরিয়ে যায় অন্তত ৬৪ কোটি টাকা। এ বছর পরিমাণটা দেড়শো কোটি ছাপিয়ে গিয়েছে। বিরোধীদের পর্যবেক্ষণ: সাধারণ মানুষের করের টাকা সরকার যখন ক্লাবে ক্লাবে বিলিয়েছে, তখন ভোটের মুখে শাসক দল পাল্টা কিছু চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।
যেমন, মেদিনীপুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী মৃগেন মাইতি। স্থানীয় পঞ্চাশটি ক্লাবের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ভোটের সময় পাশে থাকুন। হরিপালের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্য মন্ত্রিসভার বিদায়ী সদস্য বেচারাম মান্না অস্বীকার করলেও দলের অন্দরের খবর, তিনি আপন তল্লাটের ৪২টি ক্লাবকে চল্লিশ-পঞ্চাশটা করে ফ্লেক্স বানিয়ে দিতে বলেছেন। তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছেন মালদহের কালিয়াচকে বিদায়ী মন্ত্রী সাবিত্রী মিত্রও। পাশাপাশি খাস কলকাতার এন্টালিতে দাঁড়িয়ে লোকসভার তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানীয় ক্লাবগুলিকে পরোক্ষে তৃণমূলের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে গিয়েছেন।
‘পাশে থাকা’ মানে কী?
কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি চলাকালীন থানার পুলিশকে জল-টিফিন জোগানোর দায়িত্ব চেপেছে কারও ঘাড়ে। কাউকে বলা হয়েছে সপ্তাহে এক দিন এলাকায় গণভোজনের ব্যবস্থা করতে। কোনও ক্লাবকে আবার শ’য়ে শ’য়ে লজেন্স কিনতে হবে। শাসকদলের প্রার্থী পাড়ায়-পাড়ায় ঘোরার সময় তা দিয়ে কচিকাঁচাদের মিষ্টিমুখ করাবেন।
জনগণেশের গাঁটের টাকায় ভোট-ময়দানে দাক্ষিণ্য বিলির এ হেন পরিকল্পনায় কমিশন দাঁড়ি টানতে পারে কিনা, সেটাই দেখার।