ছিল বাংলা। হয়ে গেল ইংরাজি।
শিল্পসাথী হয়ে গেল সিনার্জি বিজনেস সেন্টার!
আর এই সিনার্জি সেন্টারের উদ্বোধনকে ঘিরেই বৃহস্পতিবার নবান্নে ছিল সাজ-সাজ রব। ক্যামাক স্ট্রিটে রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের ভবন ‘প্রতীতি’র একটি ঘরে তৈরি হয়েছে এই সেন্টার। নবান্ন-য় বসেই এই কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বৃহস্পতিবার রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের বাড়ি প্রতীতি-র এক তলায় একটি ঘরে জায়গা করে নিয়েছে ‘সিনার্জি বিজনেস সেন্টার’। ঘরের বাইরে সোনালি ফলকে পরপর দু’টি নাম ‘সিনার্জি বিজনেস সেন্টার’ এবং তার ঠিক নীচে ইন্ডিয়া-সিঙ্গাপুর। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম বিদেশ সফরের পরেই এই ঘরের এই নয়া নামকরণ। সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসার পরে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে এই কেন্দ্র তৈরি করতে বিশেষ সময় নষ্ট করেনি রাজ্য সরকার। শিল্পমহলের একাংশ এবং রাজ্য সরকার, দু’পক্ষেরই দাবি এমনই।
সময় লাগারও কথা নয়। ঘরটা তৈরিই ছিল। কিছু দিন আগে পর্যন্ত ‘শিল্পসাথী’র জন্য এই ঘর বরাদ্দ করা ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক কোনও ফলক ছিল না। যেমন হয়েছে সিনার্জি সেন্টারের ক্ষেত্রে। সিনার্জি সেন্টারের সঙ্গে শিল্পসাথীর কাজের কোনও তফাৎ নেই। নাম যাই হোক। রাজ্যে যাঁরা বিনিয়োগ করতে আসবেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই এ ধরনের কেন্দ্রের কাজ। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দূর করতে এক জানালা ব্যবস্থা হিসেবেই তৈরি হয়েছিল শিল্পসাথী। সিনার্জি সেন্টারের কাছে ঘর হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরে এখন শিল্পসাথীর ঠাঁই প্রতীতির দোতলায়।
শুধু তৈরি করাই নয়। ক্ষমতায় আসার পরে সরকারের শিল্পবান্ধব মুখ তুলে ধরতেই শিল্পসাথী গড়েছিল রাজ্য। শিল্প টানতে রাজ্য সরকার আয়োজিত ‘বেঙ্গল লিডস’-এর মঞ্চ থেকে এক জানলা নীতির কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেটারই আনুষ্ঠানিক নাম শিল্পসাথী। তখন শিল্পমন্ত্রী ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
ক্ষমতায় আসার ছ’মাস পরে ‘বেঙ্গল লিডস’-এ মুখ্যমন্ত্রীর এক জানলা নীতির ঘোষণা শুনে শিল্পমহল একই সঙ্গে খুশি ও হতাশ হয়েছিল। খুশির কারণ নয়া সরকারের শিল্প নিয়ে ভাবনাচিন্তা। হতাশ, কারণ শিল্পমহলের আশা ছিল প্রশাসনের প্রধান হয়ে ছ’মাস কাটানোর পরে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে শিল্পস্থাপনের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দিশা দেখাবেন।
কিন্তু সে দিন নিছক নীতির কথা ঘোষণা করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই বলেননি মুখ্যমন্ত্রী। বলা হয়নি, শিল্পসাথী ঠিক কী ভাবে কাজ করবে। জমি কেনার ক্ষেত্রে সমস্যা হলে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার ছাড়পত্র পেতে সমস্যা হলে, কী ভাবে তার দ্রুত সমাধান হবে। জানা যায়নি, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় প্রতিটি ছাড়পত্র দায়িত্ব নিয়ে শিল্প দফতরই করে দেবে কি না। ব্যর্থ হলে তার দায়ই বা কে নেবে?
শিল্পমহলের একাংশের দাবি, এ সব অনেক প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যায়নি। শিল্পসাথীর দরজায় পৌঁছে যাওয়ার পরেও বিনিয়োগকারীদের এ দফতর-সে দফতরে দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত থেকেছে। ফলে শিল্পসাথীর নামের ফলকে পরিবর্তন হলেও এই হয়রানি দূর হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নয় শিল্পমহল। সিনার্জি বিজনেস সেন্টারের উদ্বোধনের পাশাপাশি এ দিন বিভিন্ন দূতাবাসের ৫২ জন প্রতিনিধি নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রত্যেকেরই বক্তব্য ছিল, রাজ্যের উদ্যোগে বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনকে সফল করতে তাঁরা সব রকম সাহায্য করবে। চেষ্টা করবেন নিজের নিজের দেশ থেকে শিল্প প্রতিনিধিদের আনতে।
তবে প্রশাসন এবং শিল্পমহলের একাংশ বলছে, এ দিনের বৈঠকে কনসাল জেনারেলদের উপস্থিতি সেই ভাবে চোখে পড়েনি। সব মিলিয়ে ৮টি দেশের পুরোদস্তুর কনসাল জেনারেল বা গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ছিলেন। সাম্মানিক কনসাল জেনারেলরাই বেশি ছিলেন। স্থানীয় শিল্পপতিদের অনেকেই এ ধরনের পদে রয়েছেন।
সে ক্ষেত্রে তাঁদের মাধ্যমে রাজ্যের বার্তা ভিন দেশে কতটা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সে দেশের নাগরিক হওয়ার সুবাদে কনসাল জেনারেল তাঁর নিজের দেশের চাহিদার সঙ্গে এ রাজ্যের সম্ভাবনা মিলিয়ে দেখে রিপোর্ট পাঠান। স্থানীয় শিল্পপতিদের পক্ষে সব সময় এ ধরনের ভারসাম্য রাখা সম্ভব না-ও হতে পারে।
অমিতবাবু অবশ্য এ দিনের মূল অনুষ্ঠান সিনার্জি সেন্টারের উদ্বোধন নিয়ে একটি কথাও বলেননি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়ই ছিল আগামী ৭ ও ৮ জানুয়ারি বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন ঘিরে সরকারের পরিকল্পনার কথা। শিল্পমন্ত্রী বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এ বার থেকে প্রতি ছ’মাস অন্তর কনসাল জেনারেলদের নিয়ে বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে তাঁরা রাজ্যের অগ্রগতি এবং শিল্পোন্নয়ন নিয়ে নিজেদের পরামর্শ দেবেন। সরকারও তার বক্তব্য জানাবে।”