Advertisement
E-Paper

প্রকাশের পথে উদীচীর কণিকা স্মরণ সংখ্যা

শান্তিনিকেতনের চীনভবনের বারান্দায় বসে এক যুবক একলা গাইছেন, ‘আজ কি তাহার বারতা পেল রে কিশলয়’। সমে গান থামতেই যুবকের বন্ধু পিছন থেকে এসে তাড়া দিলেন, ‘‘চলো হে চলো। শ্রীভবনের সামনের খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে সে বসে আছে। চলো, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।’’

আবীর মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৫ ০৩:১২
বাংলাদেশ সফরে মুজিবর রহমানের সঙ্গে মোহর। —ফাইল চিত্র।

বাংলাদেশ সফরে মুজিবর রহমানের সঙ্গে মোহর। —ফাইল চিত্র।

শান্তিনিকেতনের চীনভবনের বারান্দায় বসে এক যুবক একলা গাইছেন, ‘আজ কি তাহার বারতা পেল রে কিশলয়’।

সমে গান থামতেই যুবকের বন্ধু পিছন থেকে এসে তাড়া দিলেন, ‘‘চলো হে চলো। শ্রীভবনের সামনের খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে সে বসে আছে। চলো, তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।’’ শেষ বিকেলে রাঙা আলোয়, যেন লজ্জা পেয়ে উঠে পড়লেন কলকাতা থেকে সদ্য আসা যুবক। কিছুদিন আগেই সুগায়িকা কনক বিশ্বাসের কলকাতার বাড়িতে ঘরোয়া আড্ডায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জর্জ বিশ্বাসের পাশে বসা এক কিশোরীর গান শুনেছেন তিনি।

দু’জন দু’জনকে দেখলেও, আলাপ হয়নি সে দিন আর। সেই কিশোরীই সখিদের সঙ্গে খেলার মাঠে বসে রয়েছেন। যুবকের বন্ধুর ডাক শুনে উঠে এলেন কিশোরী।

Advertisement

সেই আলাপ।

প্রেমে পড়ল দু’জন!

আর সেই আশ্রমের নিভৃতিতে শুরু হল দু’জনের মন দেয়া-নেয়া।

একদিন বিয়ে হয়ে গেল কিশোরী মোহরের সঙ্গে বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাঁকুড়ায় দেশের বাড়িতে বউ দেখাতে নিয়ে গিয়ে নব দম্পতি গাইলেন, ‘হে নূতন/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রখর শুভক্ষণ’।

রবীন্দ্রসঙ্গীত কিংবদন্তী শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে এমনতরো হারিয়ে যাওয়া সব স্মৃতি, স্বামী বীরেনের সঙ্গে তাঁর সংসার-সীমান্তের কথা, দুজনের সম্মিলিতভাবে লেখা বই, বইয়ের আলোচনা, মোহরের গান ও গায়কীর আলোচনা, তাঁকে নিবেদিত কবিতা এবং অজস্র দুর্লভ ফটোগ্রাফ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর শান্তিনিকেতন থেকে দু’মলাটে প্রকাশিত হতে চলেছে ‘উদীচী’ পত্রিকার কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণ সংখ্যা।

সংকলনে মোহরকে নিয়ে প্রায় দেড়শো জনের লেখক তালিকায় রয়েছেন রবিশঙ্কর, শিবনারায়ণ রায় থেকে কবি শঙ্খ ঘোষ, ভূদেব চৌধূরীদের স্মৃতি-সম্পূট। জায়গা করে নিয়েছে অবনঠাকুর, নন্দলাল, রামকিঙ্কর, বিনোদবিহারী, যোগেন চৌধুরী, সোমনাথ হোড়ের মতো শিল্পীদের আঁকা ছবিও। কয়েকটিতে দেখা যাবে প্রখ্যাত শিল্পীদের আঁকা মোহরের ছবিও। থাকছে শিল্পীর ব্যক্তিগত ডায়েরির অংশ, তাঁর লেখা অপ্রকাশিত গদ্য, চিঠি, তাঁর আত্মীয়-পরিজনের স্মৃতিও!

মোহরের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা অটোগ্রাফের খাতা, জীবনপঞ্জি, তাঁর রেকর্ড ও সিডির তালিকা, প্রাপ্ত উপাধি, শংসাপত্র, পদক ও উপহার সামগ্রীর ছবিও থাকছে সংকলনে।

বিশ্বভারতীর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের উপ গ্রন্থাগারিক বীরেনবাবুর উদ্যোগেই ১৯৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় উদীচী। পত্রিকার কাজে প্রেরণায় বরাবরই ছিলেন মোহর। তিনি চলে গিয়েছেন ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল। তারপর পরই এই বিশেষ সংখ্যাটির পরিকল্পনা করেন সম্পাদক স্বপনকুমার ঘোষ। পত্রিকার প্রথম থেকেই যুগ্ম সম্পাদনায় ছিলেন স্বপন।

বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগারের কর্মজীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে স্বপনবাবু এখন উদীচীর স্মরণ সংখ্যার কাজেই মগ্ন। প্রাক্তন উপাচার্য নিমাইসাধন বসু তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন, ‘স্বপন আমাদের বিশ্বভারতীর ফাদার টেরিজা’। কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতাতেও রয়েছে স্বপনবাবুর পরোপকারবৃত্তির কথা। ‘এই আমাদের শ্রীমান স্বপন/ সবার তিনি একান্ত জন/ কখন যে কার প্রয়োজন/ তাই ভেবে তাঁর জীবন যাপন’। তাঁকে নিয়ে লীলা মজুমদার তাঁর ‘পাকদণ্ডী’-তে লেখেন, ‘স্বপন বিশ্বের সব সমাধান জানে’। তাঁর ঋণ স্বীকার করেন প্রয়াত প্রশান্তকুমার পাল ‘রবিজীবনী’- র একাধিক খণ্ডে।

স্মরণ সংখ্যা প্রকাশের কাজ আগে ঘোষণা হলেও এত দেরি কেন?

শান্তিনিকেতনের বাগানপাড়ায় নিজের বাড়িতে বসে স্বপনবাবু বলেন, ‘‘তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছি এ পত্রিকার। উদীচী আমার নয়, বীরেনদার। তাঁর কাছেই সম্পাদনার কাজ শেখা। বীরেনদা যখন চলে গেলেন, প্রকাশ করেছিলাম তাঁকে নিয়ে একটি স্মরণ সংখ্যা। তবে মোহরদিকে নিয়ে এ সংখ্যাটির লেখা সংগ্রহের কাজে সময় লেগে গেল ঢের। অর্থও একটি কারণ। প্রকাশের জন্য বহুদিন ধরে কাজ করে চলেছি। বয়স হয়েছে, যাবার আগে না প্রকাশ করলে বীরেনদা-মোহরদির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো অপূর্ণ রয়ে যাবে।’’ তিনি কৃতজ্ঞতা জানান, সংকলনের কাজে পাশে থাকার জন্য শিল্পীর পরিবারকে।

স্মরণ সংখ্যাটির অতিথি সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক উজ্বলকুমার মজুমদার ও মোহরের স্বজন গোরা সর্বাধিকারী। গোরাবাবু বলেন, ‘‘মোহরদিকে নিয়ে এর আগে এমন বড় মাপের কাজ হয়নি। আমরা তাঁর শিল্পী ও ব্যক্তি জীবনের সব দিক ছুঁয়ে থাকার চেষ্টা করেছি।’’

উজ্বলবাবুর সংযোগ, ‘‘যে কটা দিন শান্তিনিকেতনে ছিলাম, মোহরদি আর বীরেনদার সঙ্গেই সময় কেটেছে। কত স্মৃতি! বলতে শুরু করলে, ফুরোয় না! একদিন বীরেনদা বললেন, ‘জানো উজ্বল, আজ একটা কাণ্ড ঘটিয়েছে মোহর। গয়না পালিশ করতে এসেছিল, তাকে সব গয়না দিয়ে মোহর গানের ক্লাসে চলে গিয়েছিল। ঘরে ফিরে দেখে, গয়না উধাও! চীনে বাদামের খোলা গয়নার বাক্সে!’— এমন সব স্মৃতি আর স্মরণে সাজানো উদীচীর এই মোহর সংখ্যা। খুব তাড়াতাড়ি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারব!’’ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট বোন বীথিকাদেবী বলেন, ‘‘স্বপন উদ্যোগ নিয়েছিল, সংকলনের কথা জানি। অপেক্ষাতেই আছি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy