দু’টো পরীক্ষা বাকি ছিল। কিন্তু তা আর দেওয়া হল না দাঁতনের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুব্রত জানা (১৬)-র। সোমবার বিকেলে অঙ্ক পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে দু’টি অটোর রেষারেষির জেরে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ওই ছাত্রের। তার সঙ্গী আরও তিন পড়ুয়া জখম হয়েছে। তারা মেদিনীপুর মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন।
এ দিন পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় ডুয়ার্সের নাগরাকাটা থানার চেংমারি চা বাগান এলাকাতেও দুর্ঘটনার মুখে পড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। ট্রাক্টরের ডালা খুলে ছাত্রছাত্রী মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন জখম হয়। এই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আহত ছাত্রছাত্রীদের যাতে কোনও ব্যাপারে অসুবিধে না হয়, আমরা তা দেখব।” শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে জেলাশাসকের কাছে বিশদে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
ক’দিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কোনও পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক দিতে না পারলে পরে আলাদা ভাবে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ দিনের দুর্ঘটনার পর জখম পরীক্ষার্থীদের বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রশাসক কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনের আইকোলায় এ দিন দুর্ঘটনাটি ঘটে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ। আইকোলা গ্রাম পঞ্চায়েতেরই ভুরঙ্গিপুরে বাড়ি সুব্রতর। স্থানীয় আনন্দনগর শ্রীনাথ বিদ্যাপীঠের ছাত্র ছিল সে। এ বার মাধ্যমিকে ওই বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষাকেন্দ্র হয়েছে দাঁতন ভগবতচরণ হাইস্কুলে। স্থানীয় সূত্রে খবর, অনেক পরীক্ষার্থীই একসঙ্গে অটো ভাড়া নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছিল। সেই মতো এ দিন পরীক্ষা শেষে সুব্রত-সহ মোট পাঁচ জন একটি অটোতে বাড়ি ফিরছিল। পাশে একটি অটোতে ছিল ওই বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন পরীক্ষার্থী। দাঁতন ১ পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ দীপক ঘোষ বলেন, “দু’টি অটোতে ছেলেমেয়েরা ফিরছিল। অটো দু’টি রেষারেষি করছিল। তখনই বাঁক ঘুরতে গিয়ে সুব্রতদের অটোটি উল্টে যায়।” ঘটনাস্থলেই মারা যায় সুব্রত। জখম বাকি তিন পড়ুয়া হরেকৃষ্ণ পাত্র, অমল দে এবং শিপ্রা পাহাড়িকে প্রথমে ওড়িশার জলেশ্বর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্থানান্তরিত করা হয় মেদিনীপুর মেডিক্যালে। প্রত্যেকেরই হাতে-পায়ে চোট রয়েছে। আজ, তারা ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা সংশয় রয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এ দিন দাঁতনে গিয়েছিলেন এসডিপিও খড়্গপুর অজিত সিংহ যাদব।
সুব্রতর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা পরিবার। সুব্রতর বাবা অজয় জানা কথা বলার অবস্থায় নেই। ছোট ছেলেকে দেবব্রতকে বুকে আঁকড়ে সমানে কেঁদে চলেছেন তিনি। আর বড় ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন মা শান্তিলতাদেবী। সুব্রতর কাকা বিষ্ণুপদ জানা বলেন, “অভাবের সংসারে বাড়ির কাজ থেকে বাবার সঙ্গে চাষবাস সবেতেই হাত লাগাত সুব্রত। তারই মধ্যে পড়াশোনা করছিল। মাধ্যমিকের পরীক্ষা ভাল হচ্ছে বলে জানিয়েছিল। কোত্থেকে যে কী হয়ে গেল!”
নাগরাকাটার দুর্ঘটনাটিও ঘটে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে। চেংমারি টি গার্ডেন হিন্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ট্রাক্টরে ঠাসাঠাসি হয়ে ফিরছিল লুকসান বাগানের ৭০ জন পরীক্ষার্থী। তারা সকলেই লুকসান লালবাহাদুর শাস্ত্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ুয়া। রাস্তায় ট্রাক্টরের ডালা খুলে গিয়ে জনা পঞ্চাশেক পড়ুয়া জখম হয়। আহত ওই আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের প্রথমে লুকসান প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আশঙ্কাজনক ১৫ জনকে জলপাইগুড়ি সদর এবং উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওই ১৫ জনের শরীরের যা অবস্থা তাতে আজ, মঙ্গলবার ভৌতবিজ্ঞান এবং কাল, বুধবার জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষা দেওয়া কঠিন। পরীক্ষা দিতে পারবে না জেনে কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রমীলা সুব্বা। বলে, “এক বছর ধরে মন দিয়ে পড়াশুনো করেছি। এমন হবে ভাবতে পারিনি।” ট্রাক্টর চালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এ দিকে, দুর্ঘটনার পরে পড়ুয়াদের জন্য বাসের দাবি ঘিরে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী স্কুলের শিক্ষক টিকারাম ছেত্রী বলেন, “বারবার লুকসান থেকে চেংমারি পর্যন্ত বাসের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু মেলেনি।” ব্লক মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব সঞ্জয় সাহা এবং ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক কার্তিকচন্দ্র মার্জিত জানান, লুকসান বাগানের নিজস্ব পরিষেবার উপরে নির্ভর করায় সমস্যা হয়েছে। লুকসান বাগানের ম্যানেজার অনিন্দ্য বাগচির বক্তব্য “বাগানের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। তাই পড়ুয়াদের জন্যে বাস কেনা যায়নি। তবে জখমদের চিকিৎসার খরচ বাগান দেবে।”