দু’হাত উপুড় করে রায়দিঘিকে সাজিয়েছে প্রকৃতি। প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। ইতিহাসের বহু টুকরো গল্প, লোককথা ছড়িয়ে চতুর্দিকে। কিন্তু তবু সুন্দরবনের পর্যটন মানচিত্রে দুয়োরানিই থেকে গিয়েছে রায়দিঘি। এখানকার মানুষের অভিমান, সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসাবে ক্যানিঙের কথা যে ভাবে ভেবেছে সরকার, সে ভাবে যদি রায়দিঘির কথাও ভাবা হতো, তা হলে পর্যটকের ভিড়ে এলাকার শ্রীবৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল।
এখানকার আঞ্চলিক ইতিহাস ও প্রত্ন গবেষক থেকে শুরু করে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করেন, পর্যটনের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের রূপ শুধু জল-জঙ্গল বা বন্য প্রাণীদের নিয়েই নয়। এই বনাঞ্চল ও জনপদগুলির বুকে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে দু’হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার চিহ্ন। তাই সব মিলিয়ে সুন্দরবনকে দেখতে হবে অন্য চোখে, অন্য মনে। তাঁদের যুক্তি, প্রত্ন সংগ্রহশালা ও স্থাপত্যগুলি রায়দিঘির কাছেপিঠে। তাই রায়দিঘিই সার্বিক পর্যটনের ক্ষেত্রে বেশি সম্ভাবনাময়।
উৎখনন, প্রত্ন ও ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্থলপথে রায়দিঘির কাছে দ্রষ্টব্য জায়গাগুলির অন্যতম, জটার দেউল। এটি একাদশ শতকে নির্মিত সুউচ্চ ইটের শৈব মন্দির। এ ছাড়া, কঙ্কনদিঘি কুষাণ যুগ থেকে ‘বৌদ্ধ সাধনা ক্ষেত্র’ বলে পরিচিত। আংশিক উৎখননে জানা যায়, মাটির নীচে চাপা আছে বৌদ্ধ সঙ্ঘারাম, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির মন্দির, বৌদ্ধ গুহ্য তন্ত্রের সাধনাপীঠ। উদ্ধার হয়েছে অসংখ্য পাথর ও ব্রোঞ্জের মূর্তি ও মূল্যবান প্রত্নসামগ্রী। লক্ষ্মণ সেনের আমলে নদী বন্দর ও একাদশ শতকের নারায়ণী মূর্তি ও ঊনবিংশ শতকের মন্দিরটি রয়েছে খাড়িতে। অষ্টাদশ শতকের বরখান গাজির মন্দির ও মূর্তিও এখানে দেখতে পাওয়া যাবে। ছত্রভোগে ছিল নদীবন্দর। ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দির ও মূর্তি এখনও রয়েছে। অন্ধমুনিতলায় মুনির আস্তানা মন্দিরেরও দেখা মিলবে ছত্রভোগে। তা ছাড়া, কথিত আছে, এখানে একটি পাথরে ১৫১০ সালে চৈতন্যদেবের পদচিহ্ন ধরা হয়েছিল। বড়াশিতে গেলে দেখা যাবে দেবীপুরাণ, চৈতন্যভাগবত ও মঙ্গলকাব্যে উল্লেখিত অম্বুলিঙ্গ শিবমন্দির। অম্বুলিঙ্গ ঘাট। বদরিকা কুণ্ডও এখানে অবস্থিত। চক্রতীর্থতে রয়েছে চার মহাশক্তির অধিষ্ঠান। চৈতন্য স্মৃতি বিজড়িত এলাকা এটি। চৈত্র মাসে বিখ্যাত নন্দার মেলা বসে। কাশীনগরে রয়েছে মধ্যযুগের লোকদেবী মাইবিবির মন্দির। বড়াশি, খনিয়া ও বিজয়নগর লোককাব্যের যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। কাশীনগর, খাড়ি, দক্ষিণ বিষ্ণুপুর ও জয়নগরে চারটি সমৃদ্ধ প্রত্ন সংগ্রহশালা রয়েছে।
জলপথে সজনেখালি ট্যুরিস্ট স্পট থেকে প্রত্নসমৃদ্ধস্থল ও বনাঞ্চল দেখতে পাওয়া যাবে। মনসামঙ্গল খ্যাত নেতিধোপানির ঘাট বা বনাঞ্চল, মায়াদ্বীপ, কাঁঠালবেড়িয়া, ভরতগড়, হিরন্ময়পুর, চিতুড়ি খাল ধরে দেউলবাড়ির দেখা মিলবে। আবার আজমলমারি সংরক্ষিত বন, রায়দিঘি, ঢুলিভাসানি বনাঞ্চল, চুলকাটি বনাঞ্চল (এটি ঐতিহাসিক বিজয়নগর নামেও পরিচিত) দেখতে পাওয়া যাবে। সপ্তমুখী নদীর পাশে গোবর্ধনপুর, সীতারামপুর, ইন্দ্রপুরের প্রত্নস্থল ও সংগ্রহশালা রয়েছে। ভগবতপুরে কুমির প্রকল্প রয়েছে। বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জ সমুদ্র সৈকত পেরিয়ে গঙ্গাসাগরের কপিল মুনি আশ্রম দেখা যাবে। ঘোড়ামারা দ্বীপকে পাশে রেখে কুলপির হরিনারায়ণপুর ও ডায়মন্ড হারবারের আবদালপুর হয়ে রায়চক যাওয়া যাবে।
কলকাতার মেটিয়াবুরুজ থেকে একদল পর্যটককে নিয়ে শীতের শুরুতে সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা করে হিমসিম খাচ্ছেন ইউসুফ পিয়াদা, লাল্টু ঘরামিরা। বললেন, “কোথায় কী ভাবে যোগাযোগ করব বুঝতেই পারছিলাম না। শেষে রায়দিঘিতে পরিচিত আবদুল্লা মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করি।” রায়দিঘির বাসিন্দা আবদুল্লা বলেন, “এখানে তো সরকারি ভাবে থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। হোটেলগুলির সঙ্গে কথা বলে প্যাকেজ করতে হচ্ছে। এটা খুবই সমস্যার। এই জটিলতায় পর্যটকদের আগ্রহ কমতে পারে।”
দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে হোটেল ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রায়দিঘির নীলরতন কপাট। তাঁর কথায়, “এই পথেই কম সময়ে অনেক বেশি কিছু দেখার সুযোগ রয়েছে। তবুও সরকার বিষয়টি অবহেলা করছে। অথচ আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওয়েবসাইট, গাইড পুস্তিকা করে যাবতীয় তথ্য রেখে প্যাকেজ করেছিলাম। কিন্তু সরকারি ভাবে ক্যানিংকে প্রজেক্ট করার পরে রায়দিঘিতে পর্যটকদের আসার প্রবণতা কিছুটা কমেছে।”
লজ মালিক, পর্যটনের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি লঞ্চ মালিকেরা জানালেন, রায়দিঘিতে মাঝারি মানের পাঁচটি লজ রয়েছে। লঞ্চও ছিল কয়েকটি। কিন্তু ব্যবসা সে ভাবে না হওয়ার জন্য অনেকে লঞ্চ বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার সেগুলি ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। ফলে অনেক সময় ভুটভুটিতে চেপেই ভ্রমণে যেতে হয় পর্যটকদের। সরকারি নজর না থাকায় এই ব্যবসায় উদ্যম হারাচ্ছেন অনেকে।
কলকাতা থেকে রায়দিঘি আসতে গেলে ট্রেনে শিয়ালদা থেকে প্রায় দু’ঘণ্টার পথ পেরিয়ে আসতে হবে মথুরাপুরে। সেখান থেকে মিনি বাস, অটো বা ট্রেকারে করে রায়দিঘি আসতে আরও ৪০ মিনিট। পরিবহণ ব্যবস্থা ভাল না থাকাটা সমস্যার। যদিও ব্যক্তিগত গাড়িতে ধর্মতলা থেকে ডায়মন্ড হারবার বা জয়নগর হয়ে রায়দিঘি আসতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে। সে তুলনায় ক্যানিঙে যাওয়া অনেক বেশি সহজ। সময়ও কম লাগে। তাই সরকারি ও বেসরকারি ভাবে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনের পরিকাঠামো।
তবে রায়দিঘিতে পর্যটনের সম্ভাবনার কথা মানছেন রাজ্যের সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরাও। তিনি বলেন, “সুন্দরবনে পর্যটনের ক্ষেত্রে রায়দিঘি অন্যতম প্রবেশদ্বার। এখানকার পর্যটন পরিকাঠামো গড়বে পর্যটন দফতর। এ বিষয়ে সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের সঙ্গে পর্যটন দফতরের যোগাযোগ চলছে। স্থানীয় উদ্যোগীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।” (শেষ)