Advertisement
E-Paper

‘সিপিএম আমায় তিন তালাক দিয়েছে, যারা করেছে, তাদের রাতের ঘুম হারাম করে দেব!’ একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতীক-উর

সিপিএমের সমস্ত কমিটি ও দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতির কথা জানিয়ে মহম্মদ সেলিমকে চিঠি দিয়েছিলেন। আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে কামান দাগলেন সদর দফতরে!

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৩
সিপিএমের প্রাক্তন ছাত্রনেতা প্রতীক-উর রহমান।

সিপিএমের প্রাক্তন ছাত্রনেতা প্রতীক-উর রহমান। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রাজ্য সিপিএমে তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন প্রাক্তন ছাত্রনেতা প্রতীক-উর রহমান। ডায়মন্ড হারবারের তরুণ নেতা রাজ্য এবং জেলা কমিটি তো বটেই, দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়ে মঙ্গলবার চিঠি দিয়েছিলেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে। তার পরে ৪৮ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। কেন এমন সিদ্ধান্ত, কাদের কারণে তিনি সিপিএম ছাড়ার চিঠি দিলেন? আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে তোলপাড় ফেলে-দেওয়া নেতা প্রথম সাক্ষাৎকার দিলেন আনন্দবাজার ডট কম-কে।

প্রশ্ন: চিঠি দেওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। বিমান বসু আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তার পর পার্টির তরফে কোনও বার্তা পেয়েছেন?

প্রতীক: আমার কথাটা তো অন্য। আমি তো চিঠি দিয়েছি রাজ্য সম্পাদককে। রাজ্য সম্পাদকের চেয়ারকে উদ্দেশ্য করে। সেখান থেকে কোনও বার্তা আসেনি। আমি তো বিমানদাকে চিঠি দিইনি। আমি চিঠি দিয়েছি সেলিমদাকে। তাঁর তো উচিত ছিল যোগাযোগ করা। তিনি করেননি। দ্বিতীয় কথা, আমি রাজ্য কমিটির হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপে চিঠি দিয়েছিলাম। কিছু ক্ষণ পরে দেখলাম সেই চিঠি সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। তার পরে বিমানদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। একটা নম্বর থেকে ফোন আসে। বিমানদা কথা বলেন। সেটা জানার কথা তিন জনের। আমার, বিমানদার এবং যাঁর নম্বর থেকে ফোন এসেছিল তাঁর। বিমানদা বাইরে বলার লোক নন। যাঁর নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, তিনিও বিশ্বস্ত। আমিও বলিনি বাইরে। তা হলে হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপ বা আলিমুদ্দিনের বাড়ির খবর বাইরে বেরোচ্ছে কী করে? গোপনীয়তা থাকলে আমি বিমানদার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। যারা পার্টির কথা বাইরে আনল, সেই কালপ্রিটদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যদি পার্টিটাকে বাঁচাতে চান, এখনই ব্যবস্থা নিন। আমি পার্টির সঙ্গে বসতে রাজি। যদি না-করা হয়, তা হলে বুঝব কোনও কাছের লোক, কোনও পেয়ারের লোক বা আদরের কোনও লালটুসকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সকলের ফোন ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাক। আমি আমার ফোন দিতে রাজি।

প্রশ্ন: বুধবার রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক ছিল। সূত্রের খবর, সেখানে ঠিক হয়েছে, এখনই আপনার বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হবে না। দল দেখতে চাইছে আপনি কী করেন। আপনার মতিগতি কী?

প্রতীক: আমি তো আলিমুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে। আমি দেখতে চাইছি আলিমুদ্দিন কী করে। কারণ, আমি যাঁকে চিঠি দিয়েছি, তিনি (সেলিম) তো ফোন করেননি। এটা কি ব্যাডমিন্টন না টেবিল টেনিস খেলা? যে তুমি আমায় বল দিলে আর আমি তোমায় বল দিলাম? সমস্যা নেই। ব্যাডমিন্টন বা টেবিল টেনিস খেলার হাতের জোরও আমার আছে।

প্রশ্ন: এত রাগ কেন পার্টির উপর?

প্রতীক: এই পার্টির জন্য আমি খুন হতে বসেছিলাম! এই পার্টির জন্য অসংখ্য কমরেড খুন হয়েওছেন। আমার রাগ পার্টির উপর নয়। পার্টিকে চালান এমন কিছু ব্যক্তির উপর আমার রাগ, যাঁরা হাজার হাজার প্রতীক-উরকে প্রতিদিন চুপ করিয়ে রাখতে চান, আধিপত্য দেখাতে চান। আমার কথা হয়তো জনগণের সামনে এসেছে। কিন্তু বহু কর্মী আছেন, তাঁরা প্রতিদিন এই ধরনের লোকেদের দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছেন পার্টিতেই। তাঁদের রাগও পার্টির উপর নয়। কিছু ব্যক্তির উপর। এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাঁরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। কমিউনিস্ট পার্টি তো! বিনয় কোঙার, জ্যোতি বসুদের দেখে শিখেছি। এই পার্টিতে সেলিব্রিটি কালচার চলতে পারে না। অনেক প্রতীক-উর পার্টিতে এখনও আছেন। দয়া করে তাঁদের রক্ষা করুন। এক জন প্রতীক-উর চলে যেতে পারেন। বাকিদের দিকে দেখুন।

প্রশ্ন: পার্টিতে সেলিব্রিটি কালচার চলছে?

প্রতীক: যদি পার্টিতে চিঠি আসে, জেলায় বক্তা করতে হবে তাঁদের, যাঁদের রোজ টেলিভিশনে দেখতে পাওয়া যায়, কখনও যদি দেখা যায় সেই চাহিদা তালিকায় রাজ্য সম্পাদকের নাম পাঁচ নম্বরে, তাকে কি সেলিব্রিটি কালচার বলে না? কমিউনিস্ট পার্টির কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। আমি পার্টির বিরুদ্ধে নই। পার্টি চালান, এমন একাংশের বিরুদ্ধে। পার্টির বিরুদ্ধে বলার ধৃষ্টতা আমার নেই।

প্রশ্ন: আপনি দলে এলেন কী ভাবে?

প্রতীক: ২০০৬ সাল থেকে এসএফআই করা শুরু। ২০০৯ সালে কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তার পরে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে এখানে পৌঁছেছি। কোনও বাবা-কাকা ধরে আসিনি।

প্রশ্ন: এই রাজ্য কমিটিতে এমন কেউ আছেন না কি, যিনি বাবা-কাকা ধরে নেতা হয়েছেন?

প্রতীক: আমি জানি না। অনেকে অভিযোগ করেন। তবে আমি বলতে পারব না। যাঁরা আছেন, প্রত্যেকেই আমার সহকর্মী। আমি বয়সে ছোট বলে সকলেই আমায় স্নেহ করেন। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলতে পারি, এই রাজ্য কমিটিতে আরও অনেকে আসতে পারতেন, যাঁদের যোগ্যতা আছে। তাঁরা হয়তো পারফিউম লাগিয়ে টেলিভিশনে যান না বলে বা দামি গাড়ি নেই বলে বা হাতে-পায়ে দামি ক্রিম মাখতে পারেন না বলে জায়গা পাননি। সেই অংশের আসার প্রয়োজন আছে।

প্রশ্ন: আপনি তো সেই অংশেরই প্রতিনিধি!

প্রতীক: হয়তো ছিলাম। হয়তো এটা দুর্বলতা যে, আমি বলিনি। আমি বলিনি কারণ, হোলটাইমার ছিলাম। রাজ্য কমিটির সদস্য ছিলাম। কমিটির অভ্যন্তরে কখনও কখনও বলার চেষ্টা করেছি। আবার দুর্বলের মতো কখনও হয়তো মুখ খুলিনি। অনেক প্রশ্নে, অনেক রাজনৈতিক ইস্যুতে বলা উচিত ছিল। এটা একটা যাত্রা। যখন এই পর্বে এসে কেউ অব্যাহতি নেয়, সেটা আত্মহত্যার মতো। একটা মানুষ আত্মহত্যা করে কখন? যখন তার সামনে কোনও উপায় থাকে না বলে সে মনে করে। এই পরিস্থিতি হল কেন? আমি তো একাধিক বার সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেছি।

প্রশ্ন: দলের কোন কর্মপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না?

প্রতীক: প্রথমে বলা হয়েছিল ডায়মন্ড হারবারে নওশাদ সিদ্দিকি প্রার্থী (লোকসভা ভোটে) হবেন। তিনি হলেন না। তার পরে বলল, আমায় প্রার্থী হতে হবে। আমি বললাম, আমার পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভাল না। প্রার্থী হয়ে লড়ার মতো জায়গায় নেই। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি লাগে, সেটা আমার নেই বলেও পার্টিকে জানিয়েছিলাম। পার্টি বলেছিল, পরিকল্পনা আছে। আমায় লড়ানো হল। কিন্তু বিগত জেলা সম্মেলনের পর থেকে আমায় ডায়মন্ড হারবারের কাজকর্মে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া শুরু হল। দলের মধ্যে থেকেই থ্রেট এল, নেতাদের পক্ষ না-নিলে সংখ্যালঘু হয়ে যেতে হবে। আমি বলেছিলাম। আমার নাম প্রতীক-উর রহমান। আমি ভারতে জন্মেইছি সংখ্যালঘু অংশে। আমার কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতি করার অনেক পথ খোলা ছিল। কিন্তু আমি সংখ্যালঘুর রাজনীতিই করেছি। সোচ্চারে বলেছি। সেই সোচ্চারে বলাটাই আমার কাল হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি।

প্রশ্ন: আপনি নাকি ডায়মন্ড হারবার বিধানসভার আহ্বায়ক? গত দু’মাস ধরে নিষ্ক্রিয় কেন?

প্রতীক: কতজন রাজ্য কমিটির সদস্য বিধানসভার কনভেনরের দায়িত্ব পালন করছেন? ডায়মন্ড হারবারে প্রার্থী প্রতীক-উর, দেওয়াল লিখবে প্রতীক-উর, লড়াই করবে প্রতীক-উর, থানায় যাবে প্রতীক-উর! সবই আমায় করতে হবে? কনভেনর কোনও লোক নেই? এত দিনের পার্টি? নাকি কেউ নিজের পছন্দের কাউকে বসাতে চেয়েছিলেন। সেটা বারণ করেছিলাম বলেই কি কোণঠাসা করার চেষ্টা? যাঁরা বলছেন, তাঁরা ডায়মন্ড হারবার সম্পর্কে কিছু জানেন? কত বুথ জানেন? বুথের কমরেডদের চেনেন? আমি পদলোভী নই। লোভ থাকলে অনেক আগে যেতে পারতাম। আমি ছোলামুড়ি খেয়ে মাঠে কাজ করার লোক। সেটাই করেছি।

প্রশ্ন: আপনি পুলিশকর্তার সংবর্ধনায় গিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কী ভাবে এটা করতে পারেন?

প্রতীক: সবাই জানেন জ্ঞানেশ কুমার (মুখ্য নির্বাচন কমিশনার) বিজেপির লোক। কিন্তু নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যখন অন্যরা চা-বিস্কুট খান? তাতে দোষ নেই? রাতের অন্ধকারে সমস্যা হলে অন্যেরা কেন ওই পুলিশকর্তার কাছে যেতেন? তার উত্তর নেই! আমাকে সাইড করা হবে বলেই এসব করা হচ্ছে। বলে দিক না, আমার জনপ্রিয়তাই তাঁদের চক্ষুশূল হওয়ার কারণ। বসে যাব। তার জন্য প্রতীক-উরের হাতে মদের গ্লাস আছে কিনা, কারও সঙ্গে পরকীয়া আছে কিনা খোঁজার কী দরকার?

প্রশ্ন: কে খুঁজছে?

প্রতীক: কেউ নিশ্চয়ই খুঁজছে। সময় এলে বলব। তবে যে বা যারা বলেছে, তাদের রাতের ঘুম হারাম করে দেব! আমি পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নই।

প্রশ্ন: তা হলে সিপিএমের সঙ্গে আপনার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে?

প্রতীক: আমি তো ডিভোর্স চাইনি! সংসার করতে চাইছি। আমি কনে হয়ে স্বামী আর শ্বশুরকে বলছি, সংসারে নাও। এক থালা ভাত দিতে হবে না। কিন্তু সংসারে নিয়ে কথা বলো। সংসারে না-নিলে ডিভোর্সের প্রসঙ্গই তো আসছে না।

প্রশ্ন: সিপিএম কি আপনাকে তালাক দিয়েছে?

প্রতীক: এখন তো মনে হচ্ছে তিন তালাক দিয়েছে! ধোঁয়াশা রাখছেন কেন? বলে দিন, তালাক-তালাক-তালাক। না হলে বলুন, কবুল-কবুল-কবুল। ধরি মাছ না ছুঁই পানি করে লাভ নেই। প্রশ্নহীন আনুগত্য নেই। প্রশ্ন করবই।

প্রশ্ন: আপনি আপাদমস্তক রাজনৈতিক। সিপিএম ছাড়লে কি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন?

প্রতীক: আমি রাজনীতির ছাত্র। রাজনীতি আমি ছাড়ব না। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলাম। কে কী বলল বা লিখল তার জন্য রাজনীতি ছাড়ব কেন?

প্রশ্ন: তৃণমূলে যাবেন?

প্রতীক: এই প্রশ্নের উত্তর নেই। আমি একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। এখন একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে অনেক বাঁক। সেই বাঁকের ও পারে খাদ আছে না ফুল বিছনো রাস্তা তা আমি জানি না।

প্রশ্ন: বাঁকটা পার হবেন?

প্রতীক: হ্যাঁ। বাঁকটা পার হব।

Pratik ur Rahman CPM
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy