সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে মাইক্রো অবজ়ার্ভার দিয়েই ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াচ্ছে নির্বাচন কমিশন! কমিশনের অন্দরের হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট প্রকাশ্যে এনে অভিযোগ করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অভিযোগের বিহিত চেয়ে বুধবার সন্ধ্যায় কলকাতায় নির্বাচন কমিশনের সিইও দফতরে গিয়ে অভিযোগ জানিয়ে এল তৃণমূলের এক প্রতিনিধিদল।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় একাধিক গুরুতর অনিয়ম এবং আইনি লঙ্ঘনের অভিযোগ করলেন ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যেরা। অভিষেকের অভিযোগের ভিত্তিতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কিছু অসাধু আধিকারিক এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। বুধবার সকালে অভিষেক নিজের এক্স হ্যান্ডেল পোস্ট করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরেই তৃণমূলের তরফে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি দল পাঠানো সিদ্ধান্ত হয়।
জন্মের শংসাপত্র গ্রহণে আইনি জটিলতা এবং হোয়াট্সঅ্যাপে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, স্পেশাল রোল অবজার্ভার সি মুরুগান এবং অন্য কয়েক জন পর্যবেক্ষক হোয়াট্সঅ্যাপের মতো সমাজমাধ্যমে বেআইনি নির্দেশ পাঠাচ্ছেন। সেখানে মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের বলা হচ্ছে যে, গ্রাম পঞ্চায়েতের ইস্যু করা জন্মশংসাপত্র গ্রহণ করা যাবে না। তৃণমূলের আরও দাবি, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ১৯৬৯’ অনুযায়ী গ্রাম পঞ্চায়েত একটি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ এবং তাদের দেওয়া শংসাপত্র সম্পূর্ণ বৈধ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নির্দেশ হোয়াট্সঅ্যাপে পাঠানোকে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
তৃণমূলের স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে যে, জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে এগ্জিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কেবল অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতাশালী, কিন্তু শংসাপত্র প্রদানের অধিকার কেবল পঞ্চায়েত বা পুরসভারই থাকে। আধিকারিকদের এই ভুল ব্যাখ্যার কারণে বৈধ আবেদনকারীরা ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা করছেন। রোল অবজ়ার্ভারদের লগ ইন আইডির অপব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে তৃণমূল। সেই অভিযোগে বলা হয়েছে, এক জেলার আধিকারিকের লগ ইন আইডি অন্য কোনও দূরবর্তী স্থান থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, স্পেশ্যাল রোল অবজা়র্ভার সুব্রত গুপ্ত কলকাতার বাইরে থাকলেও তাঁর আইডি ব্যবহার করে অন্য জেলার সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায় ভোটার তালিকায় কাটছাঁট করার চেষ্টা চলছে বলে তৃণমূলের দাবি। এমনকি, কলকাতার ‘টি বোর্ড’ অফিসের মতো জায়গা থেকেও এই আইডিগুলি ব্যবহার করার প্রমাণ মিলেছে বলে জানানো হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য ব্যবহৃত ইসিআইনেট পোর্টালেও গুরুতর কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, আগে আপলোড করা স্পষ্ট নথিগুলো হঠাৎ করেই অস্পষ্ট বা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভোটার তালিকায় আধিকারিকেরা নথির সত্যতা যাচাই করতে পারছেন না এবং বৈধ ভোটারদের ক্ষেত্রে ‘নথি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন’ উল্লেখ করে এমন বিরূপ মন্তব্য লিখে রাখছেন। পোর্টালে নতুন করে নথি আপলোড করার কোনও সুযোগ না থাকায় গোটা প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা হারাচ্ছে।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে পাঁচটি মূল দাবি করা হয়েছে কমিশনের কাছে। প্রথমত, গ্রাম পঞ্চায়েতের জন্মশংসাপত্র বৈধ বলে অবিলম্বে স্পষ্ট ভাবে (লিখিত) জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, অননুমোদিত স্থান থেকে লগ ইন করে করা সমস্ত নাম সংশোধন বা বাতিলের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আইপি অ্যাড্রেস এবং জিও-লোকেশন যাচাই করার জন্য একটি টেকনিক্যাল অডিট করতে হবে। চতুর্থত হোয়াটসঅ্যাপে নির্বাচনী নির্দেশ পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পঞ্চমত, ইসিআইনেট পোর্টালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নথিপত্র পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃণমূলের তরফে যান সাংসদ মহুয়া মৈত্র, মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও ব্রাত্য বসু, সাংসদ পার্থ ভৌমিক এবং প্রতিমা মণ্ডল। তাঁরা সতর্ক করেছেন যে, নির্বাচন কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তাঁরা এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন।