বুধবার ঘণ্টা দেড়েকের মায়াপুর সফরে ভক্ত সমাবেশকে ‘হরেকৃষ্ণ’ শোনালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নিজের তরফ থেকে তো বটেই, শোনালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তরফ থেকেও। একই সঙ্গে জানালেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নয়, ইসকনের সদর দফতরে তিনি এসেছেন চৈতন্য মহাপ্রভুর ‘অনন্য ভক্ত’ হিসাবে।
ইসকনে শাহের কর্মসূচিতে ভক্ত সমাবেশে বিদেশি ভক্তদের জমায়েত ছিল চোখে পড়ার মতো। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিন্দি ভাষণ বিদেশিদের কাছে পুরোপুরি বোধগম্য ছিল না ঠিকই। কিন্তু শাহের ‘হরেকৃষ্ণ’ ধ্বনিতে একাত্ম হলেন তাঁরাও।
ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মহারাজের ১৫২তম জন্মজয়ন্তীর কর্মসূচিতে বাঙালি ভক্তদের পাশে বসে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা প্রান্ত থেকে আসা ভক্তেরা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণ শুনলেন। কেউ এসেছেন পর্যটক হিসাবে, কেউ আবার স্থায়ী ভাবে নামহট্টে নাম লিখিয়েছেন। তাঁদের সিংহভাগই এখনও ভারতীয় ভাষা রপ্ত করে উঠতে পারেননি। তবুও বুধবার সকাল থেকেই চন্দ্রোদয় মন্দিরের নিকটবর্তী সভাস্থলে বিদেশি ভক্তদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কপালে রসকলি, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি বা শাড়ি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা কি আপনারা বুঝতে পারবেন? রাশিয়া থেকে আসা মধ্যবয়সি ভক্ত ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, “প্রতিটি শব্দের অর্থ হয়তো বুঝব না। কিন্তু তাঁর (শাহের) উপস্থিতি এবং ভারতের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে তাঁর যে দর্শন, তা অনুভব করতে চাই।” এক স্পেনীয় পর্যটকের কথায়, “মায়াপুর শান্তির জায়গা। এখানে ভারতের একজন শক্তিশালী নেতা আসছেন শুনেই কৌতূহল জেগেছে। ভক্তি এবং রাজনীতি যেখানে এক বিন্দুতে মেলে, সেই জায়গার পরিবেশ দেখতেই এসেছি।”
শুধুমাত্র স্থায়ী ভক্তেরাই নন, ইসকনের অতিথি নিবাসগুলিতে থাকা সাধারণ পর্যটকদের মধ্যেও শাহের ‘আধ্যাত্মিক সভা’ নিয়ে আগ্রহ দেখা গিয়েছে। ইসকন কর্তৃপক্ষের মতে, ‘‘মায়াপুর একটি বিশ্বজনীন ক্ষেত্র। এখানে আধ্যাত্মিকতার টানে সকলে এক হয়ে যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের সেই ছবিটা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।’’
বুধবার দুপুরে কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পরে হেলিকপ্টারে মায়াপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন শাহ। কলকাতা থেকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শাহের সহকর্মী ভূপেন্দ্র যাদব সড়কপথে মায়াপুর পৌঁছেছিলেন আগেই। মঞ্চে শাহের সঙ্গে ইসকনের পদাধিকারীদের পাশাপাশি তাঁরাও ছিলেন। তবে শাহ মায়াপুরের ভাষণে কোনও রাজনৈতিক কথা বলেননি। চৈতন্য মহাপ্রভুর মাহাত্ম্য তথা সমাজসংস্কারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। যাঁর জন্মজয়ন্তী পালনে আসা, সেই ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতীর জীবন ও কাজ নিয়েও কথা বলেছেন। গোটা বিশ্বে সনাতন ভাবধারার প্রচার ও প্রসারে ইসকনের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। পাশাপাশি ইসকনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মতুয়া সমাজের কথাও উল্লেখ করেছেন। শাহের কথায়, ‘‘মতুয়া সমাজও সমাজকল্যাণের ধারণাকে সর্বদা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুর সমগ্র বিশ্বকে এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে জোড়ার কাজ করেছেন।’’
ভাষণের শুরুর দিকেই শাহ প্রধানমন্ত্রীর মোদীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সকালে আমার কথা হয়েছে। আমি তাঁকে জানাই, সরস্বতী ঠাকুর মহারাজের ১৫২তম জন্মজয়ন্তীর কর্মসূচিতে যোগ দিতে মায়াপুর যাচ্ছি। উনি অন্তর থেকে আপনাদের সকলকে হরেকৃষ্ণ বলেছেন।’’ ২৪ মিনিটের ভাষণে কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য করেননি শাহ। শেষে বলেছেন, ‘‘এটি ভগবান নৃসিংহের অত্যন্ত জাগ্রত স্থান। তাঁর কৃপায় ২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা বিকশিত ভারত এবং সনাতন ধর্মের বার্তা সারা বিশ্বে পৌঁছে দিতে সক্ষম হব বলে আমার বিশ্বাস।’’
কর্মসূচি শেষে হেলিকপ্টারেই কলকাতা বিমানবন্দরে ফেরেন শাহ। শমীক, শুভেন্দুর পাশাপাশি ভূপেন্দ্রকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন। বিজেপি সূত্রের দাবি, মায়াপুরের কর্মসূচিতে রাজনীতির ছাপ পড়তে না-দিলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাজনৈতিক আলোচনা হেলিকপ্টারেই সেরে নিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সে বিষয়ে শাহের সফরসঙ্গীদের সকলেই মুখে কুলুপ এঁটেছেন।