Advertisement
E-Paper

বাঙালির পাতে পমপ্যানো আনতে উদ্যোগী রাজ্য

অভাবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। আর পমফ্রেট মাছের জোগান যখন কম, দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন বিকল্প হিসেবে ভাবতে হয় সিলভার পমপ্যানোর কথা। সিলভার পমপ্যানো। পমফ্রেট আর এই মাছের গোত্র এক। কেবল প্রজাতি আলাদা।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:৫৩
সিলভার পমপ্যানো মাছ। — নিজস্ব চিত্র

সিলভার পমপ্যানো মাছ। — নিজস্ব চিত্র

অভাবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। আর পমফ্রেট মাছের জোগান যখন কম, দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন বিকল্প হিসেবে ভাবতে হয় সিলভার পমপ্যানোর কথা।

সিলভার পমপ্যানো। পমফ্রেট আর এই মাছের গোত্র এক। কেবল প্রজাতি আলাদা। পমফ্রেটের তুলনায় একটু লম্বাটে। চামড়া একটু মোটা। তাজা পমফ্রেটের দেহে থাকে নীলাভ আভা, সিলভার পমপ্যানো সেখানে রুপোলি, চকচকে। কাঁটাও পমফ্রেটের চেয়ে মোটা। কিন্তু স্বাদ? রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগমের কর্তারা বলছেন, ‘‘দু’ধরনের মাছেরই স্বাদ, গন্ধ একেবারে এক।’’ পেঁয়াজ-টোম্যাটো দিয়ে পমফ্রেট মসালা, ফ্রাই, তন্দুরি বা সর্ষে বাটা দিয়ে রেঁধে খেতে দিলে পমপ্যানো-পমফ্রেটে তফাত করা মুশকিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পমপ্যানোতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, খনিজ পদার্থ আছে প্রচুর। ঠিক যেমন থাকে পমফ্রেটে।

কিন্তু সামুদ্রিক মাছ পমফ্রেটের জোগানের পুরোটাই নির্ভর করতে হয় সমুদ্রের উপর। কৃত্রিম ভাবে পমফ্রেট চাষ সম্ভব নয়। আর এখানেই পমপ্যানোর ইউএসপি। এই মাছ সামুদ্রিক হলেও এর চাষ সম্ভব। অর্থাৎ জোগানের ক্ষেত্রে শুধু সমুদ্রের মুখ চেয়ে থাকার দরকার নেই।

সেই জন্যই পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য উন্নয়ন নিগম হই হই করে সিলভার পমপ্যানোর চাষ শুরু করে দিয়েছে। পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছিল গত বছর। তাতে সাফল্য মেলার পরেই পুরোদস্তুর এই চাষ করা হচ্ছে। এই মাছের চাষে এ বার রাজ্যের মৎস্যজীবীদের উৎসাহ দিতে নিগম বিভিন্ন পদক্ষেপ করছে। ইতিমধ্যেই এই মাছ চাষে উৎসাহ দেখিয়েছেন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী। একটা সময়ে তেলাপিয়ার বিকল্প হিসেবে নাইলনটিকা মাছ চাষে উদ্যোগী হয়েছিল রাজ্য। তাতে সাফল্যও মিলেছিল। এখনও নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের একাংশের কাছে মাছ বলতে নাইলনটিকা। তার তুলনায় তেলাপিয়ার জোগান অনেকটাই কম।

পমপ্যানোর ক্ষেত্রে পমফ্রেটের চড়া দাম, চাহিদা অনুযায়ী জোগানের অভাবই তার বিকল্প মাছের সন্ধান করতে বাধ্য করেছে মৎস্য দফতরকে। পাইকারি বাজারে পমফ্রেটের দাম সাড়ে চারশো টাকা। খুচরো বাজারে সেটা গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচশো থেকে ছ’শো টাকায়। এমনকী কখনও কখনও সাতশো টাকাতেও বিকোয় পমফ্রেট। অথচ আড়াই-তিন দশক আগেও পমফ্রেটকে বাঙালির পাতে কুলীন মাছের মর্যাদা দেওয়া হত না। সেই সময়ে পমফ্রেটের দাম কই-পারশে-ভেটকি-ট্যাংরা, এমনকী রুই-কাতলার চেয়েও কম ছিল। এখন যেমন মূলত সিলভার পমফ্রেট মেলে, তখন একাধিক প্রজাতির পমফ্রেট পাওয়া যেত। সেই সময়ে বাজারে হামেশাই মিলত ব্ল্যাক পমফ্রেট, মৎস্যজীবী ও বিক্রেতাদের একাংশের কাছে যার চলতি নাম হালুয়া। সেটা এতটাই ওজনের যে, এক-একটি পমফ্রেট মাথা, ধড় ও ল্যাজা— তিন ভাগে কেটে নিতে হত। এখন আর সেই পমফ্রেটের দেখা কার্যত মেলে না। তবে বেঙ্গালুরুর মতো শহরে বড় ব্ল্যাক পমফ্রেট ১২০০ টাকা কেজি দরেও বিকোচ্ছে এখন।

পমফ্রেটের গুণাগুণ, একটা মাত্র কাঁটা থাকার সুবিধা ও আঁশটে গন্ধ না থাকায় এর চাহিদা মৎস্যপ্রিয় ও নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে উত্তরোত্তর বেড়েছে। কই-পারশে-ট্যাংরা পাতে না তোলা এক শ্রেণির বাঙালিও এখন দিব্যি খাচ্ছেন পমফ্রেট। অথচ ধীরে ধীরে এ রাজ্যে কমতে শুরু করেছে তার জোগান। টাকা দিয়েও অনেক সময়ে পমফ্রেট মেলে না। এর পিছনে এল নিনোকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আবার তাঁদের কারও কারও মতে, জাহাজের জ্বালানি পড়ে, সমুদ্রের দূষণে প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে বা অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে বহু প্রজাতির মাছ তাদের জায়গা বদল করছে। একই ভাবে পমফ্রেটও পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ছেড়ে অনেক সময়েই অন্যত্র চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ওই বিশেষজ্ঞরা। রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগমের মতে, পমফ্রেটের সুলভ জোগান নিশ্চিত করাটা তাদের হাতে নেই। কিন্তু বিকল্প মাছের জোগান নিশ্চিত করাটা তাদের হাতে আছে।

অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, গোয়া, মহারাষ্ট্রে এই মাছ ভাল পরিমাণে মেলে। ভারতে সিলভার পমপ্যানোর কৃত্রিম প্রজননের কাজ প্রথম করে সেন্ট্রাল মেরিন ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিএমএফআরআই)। তামিলনাড়ুর মান্দাপামে ওই সংস্থার আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে সিলভার পমপ্যানোর দশ হাজার চারা নিয়ে এসে গত বছর এপ্রিলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার আলমপুরে পরীক্ষামূলক ভাবে চাষ শুরু করে রাজ্য মৎস্য দফতর। তাদের দাবি, গত বছর সেপ্টেম্বরে আলমপুরে নিগমের হ্যাচারি থেকে তোলার সময়ে দেখা যায়, ৮৫ শতাংশ মাছই বেঁচে আছে। আর চারা থেকে মাছ হওয়ার পর এক-একটির ওজন গড়ে হয়েছে তিনশো গ্রাম। মৎস্য দফতর ওই মাছ তিনশো টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রিও করেছে। নিগমের জেনারেল ম্যানেজার বিজন কুমার মণ্ডল জানালেন, প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ টাকার মাছ সরকারের পক্ষ থেকে বিক্রি করা হয়েছে লেকটাউন, কালিন্দী, সল্টলেক, রাজারহাট, ভবানীপুর, কেষ্টপুরের বাজারে।

মৎস্য দফতরের বিশেষজ্ঞরা জানান, সামুদ্রিক মাছ হওয়ায় সিলভার পমপ্যানো নোনা জলেই চাষযোগ্য। সেই জন্য দুই ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলাকে এই চাষের উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করা হয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ওই তিন জেলায় পমপ্যানো চাষ জোর কদমে শুরু করবে রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগম। নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৌম্যজিৎ দাস বলেন, ‘‘ইতিমধ্যেই পূর্ব মেদিনীপুরের ৪৩টি মৎস্যজীবী সমিতি সিলভার পমপ্যানো চাষ করতে আবেদন জানিয়েছে। এক একটি সমিতিতে মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৫-৩০ জন। দু’মাস পরেই আমরা তাঁদের হাতে পমপ্যানোর চারা তুলে দেব।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy