ওল চাষ লাভজনক হলেও মরসুমে উন্নত জাতের ও মানের বীজ-ওল আজও দুর্লভ। স্থানীয়, অনুন্নত আর রোগাক্রান্ত ওল থেকেই কেটে কেটে বীজ বানিয়ে চাষ করতে বাধ্য হন চাষিরা। ফলে যে লাভ পাওয়ার অাশা করেন চাষিরা, তা আর পূরণ হয় না। অথচ আলুর ভাল বীজের মতোই—
১) ভাল জাতের ওলের চাহিদা থাকে তুঙ্গে।
২) কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাতে গোণা কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি কৃষিকেন্দ্র ছাড়া উন্নত জাতের ওল পাওয়া যায় না।
৩) বড় ওল থেকে কেটে বীজ ওল করার চেয়ে ৮০০ গ্রাম-এক কেজি গোটা ওল বীজ-ওল হিসাবে ২৫-৩০% বেশি ফলন দেয়। প্রতি ওলে সম্পূর্ণ মুখী থাকে।
৪) গোটা ওল থেকে কেটে কেটে বীজ বানালে ছত্রাক আক্রমণের আশঙ্কা থাকে। বীজ-ওলে যেটা হয় না।
এই সমস্ত কারণে ওল চাষের সঙ্গে উন্নত জাতের বীজ ওল চাষ করলে তা যেমন নিজের চাষের কাজে লাগবে, তেমনই বিক্রি করে আলাদা উপার্জনও করা যাবে। বাজারে সহজে বীজ-ওল পাওয়া গেলে চাষিরাও ওল চাষে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।
সাধারণ ওল আর বীজ ওলের পার্থক্য
বাজারে সব্জি হিসাবে বিক্রিত ওল এক-একটি ৭/১০, ১৫/২০কেজি হয়। চাষিরা এই একটি ওল থেকেই মুখী রেখে ৫০০ গ্রামের মতো করে কেটে লাগান। বীজ-ওল হল ছোট আকারের অর্থাৎ ৮০০ গ্রাম-এক কেজি ওজনের সম্পূর্ণ মুখী সমেত গোটা এক-একটি ওল, যার প্রত্যেকটি থেকে একশো শতাংশ গাছের নিশ্চয়তা মেলে।
কী ভাবে চাষ?
বীজ ওল চাষে উৎসাহী চাষিরা মাঘ-ফাল্গুন মাসে এক বার কষ্ট করে এক কুইন্ট্যাল ভাল জাতের ওল (কাভুর বা বিধানকুসুম) নির্ভরযোগ্য কৃষি কেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনে নিলেই এক বিঘার ওল বীজ তৈরি করতে পারবেন। বড় ওল উপর-নীচে আড়াআড়ি ভাবে চার ভাগে কেটে উপর ও নীচের ফালি থেকে ১০০-১৫০ গ্রামের ছোট টুকরো করতে হবে। গোবর গোলা জলে বা শুধু জলে লিটার প্রতি ৩ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম+ম্যাঙ্কোজেবের মিশ্র ছত্রাকনাশকের দ্রবণে ওলের টুকরো ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে ছায়াতে শুকিয়ে দেড় ফুটের ব্যবধানে এক ফুটের ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে শুকনো গোবর সারের সঙ্গে ২৫ গ্রাম নিম দানা (নিমউর্জা ইত্যাদি) ও ৫০ গ্রাম বায়ো/ হিউমিক অ্যাসিড দানা (গ্রোমাস/ হিউম্যাক্স/ বায়োজাইস ইত্যাদি) দিয়ে মুখী উপরের দিকে করে বসাতে হবে। মাথার কাটা অংশ থেকে মাস খানেকে ও নীচের কাটা টুকরো থেকে দেড়-দু’মাসে গাছ বেরোবে।
এই সময় সেচের যত্নের সঙ্গে ঘন করে লাগানো ওলের জমি আগাছামুক্ত রাখার দিকেও নজর দিতে হবে। মূল মোটা গাছের পাশ থেকে বেরনো ডগা শাক হিসাবে বিক্রি করে আয়ও করতে পারেন।
টুকরো ওল বসানোর ২/৩/৪ মাসে গোড়ার মাটি তুলে নিকাশি ঠিক রেখে এক চামচ ইউরিয়া+এক চামচ ১০:২৬:২৬ সার+এক চামচ হিউমিক/ বায়ো দানা দিন। আশ্বিনের শেষ থেকে কার্তিকে গাছ শুকিয়ে এলে কেজি খানেকের মতো গোটা ওল তুলে কিছু দিন রোদ-বাতাস খাইয়ে ছত্রাকনাশকে শোধন করে (বসানোর সময়ের মতো) খড় বিছানো ঘরে এক সারিতে রেখে দিন। ৪-৫ মাস রাখার পরে ভাল দামে বিক্রি করুন বা নিজেই চাষ করুন।
মাত্র এক কুইন্ট্যাল (২৫ টাকা কেজি দর হলে ২৫০০ টাকা পড়বে) ২.৫ কাঠায় লাগিয়ে ৮-১০ কুইন্ট্যাল ফলন অনায়াসে পাবেন। এবার ২৫-৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলে লাভ কত থাকে— নিজেই হিসাব করে দেখুন।
লেখক: সহ-উদ্যানপালন অধিকর্তা, মুর্শিদাবাদ ও সব্জি বিশেষজ্ঞ, রাজ্য কিসান কল সেন্টার। আরও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন এই নম্বরে: ৯৪৭৪৫৭৮৬৭১।