মকর সংক্রান্তির আগের দিন পীরের মাজারে চাদর চড়াতে ওড়িশার বস্তা থেকে সপরিবারে এসেছেন গোলাম হাবিব রজা। কিন্তু সমস্যা একটাই। এখানে থাকার কোনও জায়গা নেই।
ওড়িশা থেকেই এসেছেন হাসিনা বিবি, রুকসানা খাতুনরা। তাঁরা বলেন, “মহিলাদের পক্ষে এটা কত বড় সমস্যার। স্নান দিঘিতেই বা করা যায়। কিন্তু শৌচাগার নেই। শিশুদের নিয়েও শীতে পড়ে থাকতে হয়। এমন ব্যবস্থায় আবার আসতে ইচ্ছে করবে না। এসব শুনলে পরিচিতরাও আসবে না।”
ওড়িশার ভদ্রক থেকে স্ত্রীকে নিয়ে দু’দিনের ছুটিতে দাঁতন ঘুরে দেখতে এসেছিলেন সেখানকার সরকারি চিকিৎসক কানাইলাল গিরি। হতাশা লুকিয়ে না রেখে তিনি বলেন, “ বন্ধুদের কাছে এই মেলা, দিঘি আর বৌদ্ধবিহারে নাম শুনে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে কোনও ব্যবস্থাই নেই। বাধ্য হয়ে সতেরো কিলোমিটার দূরে জলেশ্বরের হোটেলে থাকছি।”
মূল কথা দাঁতন নিয়ে প্রচার হয়েছে অনেক। কিন্তু পর্যটকদের জন্য কোনও ব্যবস্থাই করা হয়নি। যার ফলে ভোগান্তির সীমা নেই।
শরশঙ্কা দিঘি ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেন সকলেই। বাম আমলে ১৯৮২ সালে দিঘির পাড়ের ১৫০ একর জমিতে ২৮ টি পুকুর কেটেই ক্ষান্ত হয়েছিল সরকার। তৃণমূল সরকার আসার পরে অনেক পরিকল্পনা ও আশার কথা শুনিয়েছিল এই দিঘি নিয়ে। জলসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি ও উদ্যানপালন, মৎস্য ও পর্যটন দফতর মিলে প্রায় ৬৯ সত্তর কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পরে গোটা প্রকল্পে খরচ হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা। ওই টাকায় দিঘি সংস্কার ও দিঘিতে জল ঢোকা ও বেরনোর চারটি ব্যবস্থা হয়েছে। এর বাইরে কোনও কাজ হয়নি। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিকভাবে দিঘির পাড়ে পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের বিশ্রাম ছাউনি ও কর্টেজ করার জন্য ২০১৩ সালে প্রায় তিরিশ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছিল পর্যটন দফতর। প্রকল্প ছিল আশি লক্ষ টাকার। সেই টাকা দেওয়া হয়েছিল পূর্ত দফতরকে। কিন্তু কাজ না হওয়ায় সেই টাকা ফেরত গিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, দিঘি সংস্কার হওয়ার অনেক আগেই ওই টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। পূর্ত দফতরও গড়িমসি করেছিল। তাই ওই টাকা খরচ করা যায়নি।
জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানান, রাজ্য বাজেটে ধাপে ধাপে টাকা বরাদ্দ হলে কাজ হবে। প্রকল্পটি বেশ বড়। তাই তার কাজও স্তরে স্তরা ভাগ করা রয়েছে। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, দিঘির চার পাড়েই হবে উন্নয়নের কাজ। পুরো জমিটাই ভূমি দফতরের এবং দিঘির পাড়ে তাই পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন করা হবে। পর্যটক ও স্থানীয়দেরদের জন্য কর্টেজ, বোটিং ব্যবস্থা, ভেষজ উদ্যান, পানীয় জল ও কৃষি সেচ প্রকল্প, মৎস্য চাষ, প্রমোদ উদ্যান, সৌন্দর্যায়ন, ফুল চাষ, চারটি আধুনিক স্নানের ঘাট, সবুজায়ন ইত্যাদি করা হবে।
দাঁতনের বিধায়ক সিপিআইয়ের অরুন মহাপাত্রের কটাক্ষ, “এই সরকার তো পরিকল্পনা ঘোষণা করেই বলে একশো শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে। শরশঙ্কা নিয়ে এ আর নতুন কথা কী। ভোট এলেই ওরা এই সব পরিকল্পনার কথা শুনিয়ে মানুষের মন পেতে চায়। কাজ হোক তা আমরাও চাই। ” যদিও এই রাজনৈতিক আক্রমনের জবাবে তৃনমূলের দাঁতন ১ ব্লক সভাপতি বিক্রম প্রধান বলেন, “পরিকল্পনা গ্রহণের দু’বছরের মধ্যে আমরা দিঘি সংস্কার করেছি। বাকি কাজগুলিও ধাপে ধাপে হবে। পরিকল্পনাটি পাঁচ বছরের। সময় তো লাগবেই।”
আপাতত সেই সময়ের অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ।