চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে দায়ের করা ক্ষতিপূরণের মামলা বাতিল করে দিয়েছিল জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা করেন সুষমা সাউ নামে হাওড়া-সালকিয়ার এক বাসিন্দা। অভিযুক্ত চিকিৎসককে দোষী সাব্যস্ত করে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালত ক্ষতিপূরণ বাবদ ওই মহিলাকে সাত লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসক তপনকুমার খান জানান, এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর অন্তঃসত্ত্বা সুষমাদেবী জরায়ুমুখ থেকে প্রবল রক্তপাত নিয়ে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ তপনকুমার খানের কাছে যান। চিকিৎসক দু’বার ইউএসজি করিয়েও জরায়ুতে ভ্রূণ দেখতে পাননি। তিনি রোগিণীকে ওষুধ দেন। সুষমাদেবীর অভিযোগ, ‘‘ওষুধ খাওয়ার পরেও আমার জরায়ু থেকে অনবরত রক্ত বেরোতে থাকে। চিকিৎসক ১২ দিন পরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, চার দিন পরেই ফের ডাক্তারবাবুর কাছে যেতে বাধ্য হই। কিন্তু আমার শারীরিক সমস্যাকে আমল না-দিয়ে উনি কেবল ওষুধ খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শ দেন।’’
সুষমাদেবী জানান, জরায়ু থেকে নাগাড়ে রক্তপাত হতে থাকায় তাঁর হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১২ থেকে নেমে পাঁচ হয়ে যায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গিরিশ পার্ক এলাকার একটি নার্সিংহোমে ভর্তি হন তিনি। সেখানে জানা যায়, ভ্রূণ তাঁর জরায়ুতে নেই, রয়েছে ফ্যালোপিয়ান টিউবে। চিকিৎসা পরিভাষায় এটাকে বলে ‘একটপিক প্রেগন্যান্সি’।
২০০৮ সালে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে চিকিৎসক তপনবাবুর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করেন সুষমাদেবী। ওই আদালত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের দিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গড়ে দেয়। সেই বোর্ডের রিপোর্টে চিকিৎসকের গাফিলতির উল্লেখ ছিল। তবে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত তাদের রায়ে জানিয়ে দেয়, চিকিৎসকের ভুল ছিল না।
সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা করেন সুষমাদেবী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ওই আদালতের বিচারক কালিদাস মুখোপাধ্যায় জেলা আদালতের রায়ের সমালোচনা করে জানান, মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট অগ্রাহ্য করে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত যে-ভাবে চিকিৎসকের গাফিলতির অভিযোগকে নস্যাৎ করেছে, তা ঠিক নয়। চিকিৎসক যা করেছেন, তাতে রোগিণীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিচারকের পর্যবেক্ষণ, ‘‘মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী রক্তপাত হতে থাকা গর্ভবতীর জরায়ুতে যখন ভ্রূণের দেখা মিলল না, তখন চিকিৎসকের বোঝা উচিত ছিল, ‘একটপিক প্রেগন্যান্সি’র সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা দরকার ছিল। চিকিৎসক উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন।’’
অভিযুক্ত চিকিৎসক তপনবাবু রাজ্য আদালতের বিরুদ্ধে একতরফা রায় দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন। ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসাবিদ্যার কিছু সুবিধা-অসুবিধার উল্লেখ করে তাঁর বক্তব্য, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার দু’মাসের মধ্যে একটপিক প্রেগন্যান্সি বোঝা যায় না। ওই রোগিণী তাঁর কাছে গিয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার এক মাস ১০ দিনের মাথায়। ‘‘আমার চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোনও গাফিলতি ছিল না। ক্ষতিপূরণ দিতে বলে যে-রায় দেওয়া হয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জাতীয় ক্রেতা আদালতে যাব,’’ বলেছেন ওই চিকিৎসক।
রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের ওই রায় এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকের সাফাইয়ের টানাপড়েন সম্পর্কে অন্য চিকিৎসকেরা কী বলছেন?
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, চিকিৎসক দু’বার ইউএসজি করেও রোগিণীর জরায়ুতে ভ্রূণ পাননি। সে-ক্ষেত্রে ভ্রূণের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য আরও পরীক্ষা দরকার ছিল। তিনি বলেন, ‘‘ঠিক সময়ে একটপিক প্রেগন্যান্সির চিকিৎসা না-হলে রোগিণীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। সুষমাদেবীর বরাত ভাল, ওই দুর্ভোগের পরেও তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।’’ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ গৌতম মুখোপাধ্যায় বক্তব্যও অভিযুক্তের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। ‘‘জরায়ু থেকে সমানে রক্ত বেরোতে দেখেও চিকিৎসক অন্তঃসত্ত্বাকে বাড়ি যেতে বললেন, এটা স্রেফ ভাবা যায় না,’’ বললেন গৌতমবাবু।