Advertisement
E-Paper

ভাড়ার গন্ধমাদনেই বেহাল বেহালা শিল্পতালুক

কন্টিনেন্টাল কেমিক্যাল কর্পোরেশন। বেহালার শিল্পতালুকে ব্যবসা করার জন্য ছোট মাপের এই সংস্থাটিকে জুলাই পর্যন্ত প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হতো ২২৯৫ টাকা। ‘রক্ষণাবেক্ষণ’-এর নামে অগস্ট থেকে তাদের মাসিক ভাড়া বেড়ে হয়েছে এক লক্ষ চার হাজার ৭৫৭ টাকা। প্রীতি প্রিন্টিং ওয়ার্কস। বেহালা শিল্পতালুকেরই এই সংস্থাকে আগে মাসে ২৮৭৭ টাকা ভাড়া দিতে হতো। সেপ্টেম্বর থেকে সেটা বেড়ে হয়েছে এক লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৪৮ টাকা।

চিরন্তন রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৪ ০২:৫৪
শিল্পতালুকের রাস্তার বেহাল দশা। ছবি: অরুণ লোধ।

শিল্পতালুকের রাস্তার বেহাল দশা। ছবি: অরুণ লোধ।

• কন্টিনেন্টাল কেমিক্যাল কর্পোরেশন। বেহালার শিল্পতালুকে ব্যবসা করার জন্য ছোট মাপের এই সংস্থাটিকে জুলাই পর্যন্ত প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হতো ২২৯৫ টাকা। ‘রক্ষণাবেক্ষণ’-এর নামে অগস্ট থেকে তাদের মাসিক ভাড়া বেড়ে হয়েছে এক লক্ষ চার হাজার ৭৫৭ টাকা।

• প্রীতি প্রিন্টিং ওয়ার্কস। বেহালা শিল্পতালুকেরই এই সংস্থাকে আগে মাসে ২৮৭৭ টাকা ভাড়া দিতে হতো। সেপ্টেম্বর থেকে সেটা বেড়ে হয়েছে এক লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৪৮ টাকা।

শুধু কন্টিনেন্টাল বা প্রীতিই নয়। রাজ্যের প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী (এখন শিক্ষামন্ত্রী) পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিধানসভা এলাকার ওই ক্ষুদ্রশিল্প তালুকে যে-১০৬টি সংস্থা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই ভাড়া এক ধাক্কায় বেড়েছে ৪০-৫০ গুণ! ‘সৌজন্য’, রাজ্যের ক্ষুদ্রশিল্প উন্নয়ন নিগম।

কিন্তু কয়েক দশকের পুরনো ওই শিল্পতালুকে হঠাৎ এক লাফে এতটা ভাড়া বাড়ানো হল কেন?

রাজ্য ক্ষুদ্রশিল্প উন্নয়ন নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পারভেজ আহমেদ সিদ্দিকির যুক্তি, রাজ্যের সব ক’টি শিল্পতালুকে যাতায়াতের রাস্তা, আলো, জল এবং নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন দিতে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হচ্ছে। নিগমের পক্ষে এই ভার বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ঠিক হয়েছে, এখন থেকে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করতে হবে সংস্থাগুলিকেই। “সেই জন্যই নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে,” বললেন পারভেজ।

কিন্তু সরকারের এই নতুন বিজ্ঞপ্তি অশনি-সঙ্কেত বয়ে এনেছে শিল্প-খরার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে। অস্বাভাবিক হারে ভাড়া বৃদ্ধির ফরমানে বেহালার শিল্পতালুকটাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিল্পমহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, এই সরকারের আমলে শিল্পে যখন বন্ধ্যাদশা চলছে, তখন বেমক্কা ভাড়া বাড়িয়ে এমন একটি চালু শিল্পতালুককে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কেন?

তালুকের বিভিন্ন সংস্থার বহু কর্মী ও মালিকের ধারণা, শিল্পতালুক তুলে দিয়ে রিয়্যাল এস্টেট বা জমি-বাড়ির ব্যবসায়ীদের কাছে ওই জমি বেচে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এক লাফে এতটা ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শিল্পতালুকের কর্মী ও মালিকদের নির্বাচিত সংগঠনের সভাপতি বিজয় শর্মা জানান, হাজার দুয়েক মানুষ প্রত্যক্ষ ভাবে ওই তালুকের সঙ্গে জড়িত। আর পরোক্ষ ভাবে এর সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষ। নিগমের সঙ্গে সংস্থাগুলির লিজ-চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ বছর অন্তর ১০ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়ার কথা। সেই অনুযায়ী জুলাই পর্যন্ত ভাড়া ছিল প্রতি বর্গফুটে ৮০ পয়সা থেকে আড়াই টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হতো পরিষেবা কর ও পুরকর। অগস্ট থেকে সেই সব নিয়মনীতি পরিবর্তন করে বিপুল হারে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধাক্কা সামলাতে না-পেরে ওখানকার কোনও কোনও সংস্থা ইতিমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ কারখানার গেটই খুলছে না।

তালুকের একাধিক সংস্থার কর্তাদের বক্তব্য, ভাড়া বাড়লে তাঁদের আপত্তি নেই। আপত্তিটা বৃদ্ধির হার নিয়ে। যে-হারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, বড় শিল্প সেটা মেনে নিতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্রশিল্পের পক্ষে কোনও ভাবেই এই ভার বহন করা সম্ভব নয়। এতে ছোট শিল্প মারা পড়বে। ওই সব সংস্থার কর্তাদের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিগম-কর্তা। অথচ নিয়মিত পরিষেবা কর দেওয়া সত্ত্বেও এখনও দমকলের সার্টিফিকেট, পুরসভার ট্রেড লাইসেন্স মেলেনি। অর্থাৎ পরিষেবাতেও খামতি।

কিন্তু পরিষেবায় টান পড়ার কথা নয় বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হিসেব অনুযায়ী ওই শিল্পতালুকে বছরে কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসা হয়। রাজ্যের ‘একমাত্র লাভজনক’ এই তালুক থেকে ফি-বছর কয়েকটি কোটি টাকা লাভ করে সরকার। এখানে তৈরি চামড়ার নানান সামগ্রী, রং, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রাংশ, বিস্কুট তৈরির মেশিন এবং অন্যান্য পণ্য বিদেশেও রফতানি করা হয়। ভাড়ার নতুন ব্যবস্থায় এমন একটি শিল্পতালুক শুকিয়ে মারা যাবে।

প্রশ্ন উঠছে, অগস্ট থেকে বর্ধিত এই ভাড়া কি বরাবর একই থাকবে?

সরাসরি জবাব এড়িয়ে গিয়েছেন ক্ষুদ্রশিল্প দফতরের সচিব রাজীব সিংহ। তিনি জানান, ভাড়া বাড়ানোটা নিগমের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে রাজীববাবুও মনে করেন, “এক দফায় এতটা ভাড়া বাড়ায় সমস্যায় পড়তে পারেন ছোট ব্যবসায়ীরা।”

ভাড়া বাড়ানো নিয়ে নিগমের ব্যাখ্যা যা-ই হোক, বেহালা শিল্পতালুকের জমি রিয়্যাল এস্টেটের মালিকদের কাছে বেচে দিতেই সরকারের এই পদক্ষেপ বলে মনে করেন ওখানকার অনেক ব্যবসায়ী। তাঁদের এই সন্দেহ জোরদার হয়েছে সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনায়। এলাকার পুর-প্রতিনিধি, তৃণমূলের দোলা সরকার গণেশ পুজোর দিন তালুকে গিয়ে জানান, বেহালা শিল্পতালুকের জমিতে আবাসন তৈরির চক্রান্ত চলছে। পরে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি অবশ্য আর কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে শাসক দলের স্থানীয় অনেক নেতাও ওই একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

শাসক দলের পুর-প্রতিনিধির মন্তব্য ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা উস্কে দিয়েছিল। আর তাঁদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে একটি বিজ্ঞাপন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি ওয়েবসাইটে কসবা শিল্পতালুকের কয়েকটি বাণিজ্যিক প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, নিগম যদি ওই সব প্লটের মালিক হয়, সে-ক্ষেত্রে তা বিক্রির বিজ্ঞাপন কোনও বেসরকারি এজেন্সি দিল কেন? কেনই বা সরকারি ওয়েবসাইটকে এড়িয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল বেসরকারি ওয়েবসাইটে?

ক্ষুদ্রশিল্প দফতরের এক কর্তার বক্তব্য, কসবা শিল্পতালুকের বেশ কয়েকটি প্লট আছে বেসরকারি সংস্থা আর নিগমের যৌথ উদ্যোগের অধীনে। সেই সব প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে বেসরকারি এজেন্সি। এটা হতেই পারে। বেহালা শিল্পতালুকের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। কারণ, সেখানে নিগমই সব প্লটের মালিক।

নিগম কি শিল্পতালুকের জমি বেসরকারি সংস্থার কাছে বেচতে চায়?

নিগমের তরফে এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে তালুকের ফাঁকা জায়গায় নতুন নির্মাণের ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। এক নিগম-কর্তা জানাচ্ছেন, পুরনো পরিকাঠামো অটুট রেখেই সেই কাজ করা হবে। ব্যবসায়ী এবং ওই এলাকার বহু বাসিন্দা জানান, বেহালা শিল্পতালুকে ৪৬ একর জমি রয়েছে। তালুকে প্রতি কাঠা জমির বাজারদর এখন ৩০ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে গোটা তালুকের জমি বিক্রি হলে দাম এক হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে।

ওই টাকা পেতেই কি সরকার ভাড়া বৃদ্ধির নামে ছোট ব্যবসায়ীদের উপরে অস্বাভাবিক আর্থিক বোঝা চাপিয়ে শিল্পতালুকের জমি হাত বদল করতে চাইছে, উঠছে প্রশ্ন।

Behala Industrial belt chirantan roychowdhury
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy