Advertisement
E-Paper

মাও-হানার এক দশক পরেও শূন্যতা

মাওবাদী হানায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বন বাংলো দু’টো। তারপর কেটে গিয়েছে এগারোটা বছর। কিন্তু পর্যটকদের জন্য এখনও সেখানে কোনও পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বেসরকারি প্যাকেজ ট্যুরের তালিকা থেকে তাই বাদ এই পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রটি।

কিংশুক গুপ্ত

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৩৫
পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা কাঁকড়াঝোর

পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা কাঁকড়াঝোর

মাওবাদী হানায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বন বাংলো দু’টো। তারপর কেটে গিয়েছে এগারোটা বছর। কিন্তু পর্যটকদের জন্য এখনও সেখানে কোনও পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বেসরকারি প্যাকেজ ট্যুরের তালিকা থেকে তাই বাদ এই পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে এখনও নিঃসঙ্গ কাঁকড়াঝোর।

জঙ্গলমহলের পর্যটন-পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারিস্তরে নানা ঘোষণা রয়েছে। কিছু প্রকল্পের কাজ হয়েছে আর বাকি কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। সেই উন্নয়ন-তালিকায় কিন্তু কাঁকড়াঝোর নেই! অথচ ওই কাঁকড়াঝোরেই এক সময় পাহাড় ও জঙ্গলঘেরা অপরূপ নৈসর্গের টানে পর্যটকদের ঢল নামত। বন বাংলোয় রাত্রিযাপন করতেন পর্যটকরা। ষাটের দশকে বন দফতরের উদ্যোগে প্রথমে ‘বনানী’ নামে একটি বন বাংলো তৈরি হয়েছিল। সেখানে ছিল মাত্র দু’টি ঘর। পরে ২০০১ সালে আরও বেশি পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জন্য রাজ্য বন উন্নয়ন নিগমের উদ্যোগে পৃথক একটি দোতলা প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়। পর্যটক আসার ফলে স্থানীয় আদিবাসীরা উপকৃত হতেন। কেউ করতেন গাইডের কাজ, কেউ পর্যটকদের জন্য রান্না।

ছবিটা বদলে যায় ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর। ওই রাতে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দু’টি বন বাংলো ধ্বংস করে দিয়েছিল মাওবাদীরা। অতীতের স্মৃতি বিজড়িত ‘বনানী’ বাংলোটি একেবারে ধূলিসাত্‌ হয়ে গিয়েছিল। ‘বনানী’র জায়গাটি এখন কার্যত ‘গ্রাউণ্ড জিরো’। তুলনামূলক ভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রকৃতিভ্রমণ কেন্দ্রের দোতলা ভবনটি। ওই ভবনটি সংস্কার করে এখন সিআরপি’র ক্যাম্প তৈরি হয়েছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছর ঝরে ঝাড়গ্রামে এখন অনেক পর্যটক আসছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগেপ্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু ভ্রমণ সংস্থাগুলি কাঁকড়াঝোরকে বাদ দিয়েই বেলপাহাড়ির অন্য দ্রষ্টব্য জায়গাগুলিতে পর্যটকদের নিয়ে যাচ্ছেন। কেন? ঝাড়গ্রামের একটি বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থার কর্ত্রী দেবশ্রী শ্যামল বলেন, “বেলপাহাড়ি থেকে দীর্ঘ পাহাড়ি-পথ পেরিয়ে কাঁকড়াঝোর পৌঁছে ক্লান্ত পর্যটকরা একটু বিশ্রাম নিতে চান। কিন্তু কাঁকড়াঝোরে পর্যটকদের জন্য কোনও বসার জায়গা নেই। নেতাই বাদ রাখা হয়েছে কাঁকড়াঝোরকে।” ঝাড়গ্রামের ভাড়া গাড়ির চালক শেখ সাবের আলি বলেন, “কাঁকড়াঝোরে পর্যটকদের নিয়ে গেলে তো আমাদেরই লাভ। কিন্তু ওখানে তো থাকার জায়গা নেই। ফলে, পাহাড়ি পথে গিয়ে আবার ফিরে আসার ধকল নিতে চান না পর্যটকরা।” ব্যক্তিগত ভাবে ভাড়ার গাড়িতে কাঁকড়াঝোরে পৌঁছে হতাশ হচ্ছেন কলকাতার সীমা রায়, লাল্টু রায়, আর্যস্নাত দত্ত-র মতো পর্যটকরা। তাঁদের বক্তব্য, “পর্যটকরা যে বসবেন, সেরকম কোনও ব্যবস্থাও তো নেই।”

মাওবাদী হানায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বন বাংলোর ধ্বংসস্তূপ

বেলপাহাড়ি থেকে ওদলচুয়া হয়ে ২২ কিলোমিটার চড়াই উতরাই পিচরাস্তা ধরে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যায় কাঁকড়াঝোরে। ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সীমানা ঘেঁষা এই গ্রামটি একেবারে ছবির মতো। কাঁকড়াঝোরের পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে পাহাড়ের সারি। পূর্ব দক্ষিণে রয়েছে মারো পাহাড়, দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে খচলা পাহাড়। একেবারে পশ্চিমে রয়েছে লাকাইসিনি পাহাড়। চারিদিকে ঘন শালের জঙ্গল। এ ছাড়াও পিয়াশাল, কেঁদ, নিম, হরিতকী, বহেড়ার মতো নানা গাছগাছালি রয়েছে। জঙ্গলে ভেষজ উদ্ভিদের সংখ্যাও কম নয়। এখনও জঙ্গলে মাঝে মধ্যে বন শুয়োর, সজারু ও ময়ূর দেখা যায়। পাহাড়ি হাঁটা পথ ধরে যাওয়া যায় মাকলি ঝর্না, ময়ূরঝর্না, ভুমরুগুহার মতো দর্শনীয় জায়গাগুলি। স্থানীয় বাসিন্দা মঙ্গল সিংহ, সুনীল সিংহ, লক্ষ্মী মুড়া-রা বলেন, “এক সময় পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত এখানে। ট্যুরিস্ট বাবুদের কাছে মুরগি বেচে, গাইডের কাজ করে দু’টো বাড়তি রোজকার হত। এখন ট্যুরিস্টবাবুরা তো তেমন আসেন না।”

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তরা সিংহ বলেন, “কাঁকড়াঝোরে পর্যটকদের জন্য পরিকাঠামো গড়ার প্রস্তাব কেউ দেননি। এ ব্যাপারে প্রস্তাব এলেই আমরা উদ্যোগী হব।” রাজ্যের বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন বলেন, “কাঁকড়াঝোড়ে নতুন করে বন বাংলো তৈরির ব্যাপারে প্রশাসনিকস্তরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy