বামফ্রন্টের শেষের দিকে সরকার পরিবর্তন চেয়ে কলকাতার রাজপথে নেমেছিলেন বিশিষ্টজনরা। সেই পরিবর্তনের পরিবর্তন চেয়ে শুক্রবার আবার পথে দেখা যাচ্ছে বিশিষ্টদের। দলীয় ঝাণ্ডা ছেড়ে তাঁদের সঙ্গে অরাজনৈতিক মিছিলে পা মেলালেন কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, পিডিএস-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা। মিছিলে না হাঁটলেও, এই কর্মসূচিকে চিঠি দিয়ে সমর্থন জানালেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো আরও অনেকেই।
প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও মঞ্চ’ এ দিন কলেজ স্ক্যোয়ার থেকে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ পর্যন্ত মিছিল করে। তাঁদের মূল দাবি ছিল, রাজ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন। মিছিলের পরে ধর্মতলায় তাঁরা সমাবেশও করেন। এ দিন আলিপুর থানার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অশোকবাবু বলেন, “যেখানে থানায় পুলিশ আক্রান্ত হয়ে টেবিলের নীচে পালিয়ে বাঁচে, সেখানে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কী করে রক্ষা পাবে?” অতীতে বাম সরকারের পরিবর্তনের দাবিতে পথে হেঁটেছেন অধ্যাপক সুনন্দ সান্যাল। এ দিন তিনি পরিবর্তনের পরিবর্তনের ডাক দিয়ে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, দলতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র চাই। কিন্তু এখন মমতা আর গণতন্ত্র চান না। সর্বত্র দলতন্ত্র চান। তাই আবার আমরা পরিবর্তন চাইছি।” বাম জমানায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের সময় থেকে বিভিন্ন ঘটনায় বারবার সরব হতে দেখা গিয়েছিল বিশিষ্টদের। নন্দীগ্রামে তৎকালীন শাসক সিপিএমের ‘সূর্যোদয়ে’র প্রতিবাদে কলকাতায় বিরাট অরাজনৈতিক মিছিলে অপর্ণা সেন-সহ বিশিষ্টরা সামিল হয়েছিলেন। চলচ্চিত্রোৎসবের সময়ে সেই মিছিল পুলিশের বাধা পেয়েছিল। ২০১১ সালের ভোটের আগে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক ঘটনার প্রতিবাদে বিশিষ্টজনেদের পথে নামতে দেখা গিয়েছে। পরিবর্তনের পরে আবার তাঁদের পথে নামতে হচ্ছে। এ দিনের আগে কামদুনি-কাণ্ডের প্রতিবাদে পথে নেমেছিলেন শঙ্খ ঘোষের মতো বিশিষ্টরা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে সম্প্রতি ঝাণ্ডা ছাড়া ছাত্র-যুবদের মিছিলও হয়েছে কলকাতায়।
এ দিন ছোট গাড়ির উপরে চড়ে মিছিল নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এই মঞ্চের উদ্যোক্তা কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান ও সংগঠনের আহ্বায়ক অসীম চট্টোপাধ্যায়। মিছিলের সামনের সারিতে এক সঙ্গে পা মিলিয়েছিলেন বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার হাসিম আব্দুল হালিম, সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী, প্রাক্তন মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্য, সিপিআইয়ের মঞ্জুকুমার মজুমদার, ফরওয়ার্ড জয়ন্ত রায়, কংগ্রেসের শিখা মিত্র, মালা রায়, কৃষ্ণা দেবনাথ, পিডিএসের সমীর পূততুণ্ড প্রমুখ। ছিলেন দুই প্রাক্তন উপাচার্য আনন্দদেব মুখোপাধ্যায় ও অশোকনাথ বসু। ছিলেন কামদুনি আন্দোলনের মুখ প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, কার্টুন-কাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া অম্বিকেশ মহাপাত্র। স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে হাওড়ার বালিতে খুন হওয়া তৃণমূল নেতা তপন দত্তের স্ত্রী প্রতিমা দত্ত হাঁটছিলেন। আবার সুঁটিয়ার বরুণ বিশ্বাসের হত্যাকারীদের শাস্তি চেয়েও হাঁটছিলেন একদল মানুষ। সব মিলিয়ে কারও বিরুদ্ধে নাম করে স্লোগান না দিয়েও মিছিলের মানুষ রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মুখ্যমন্ত্রী দায়ী করে তাঁর পরিবর্তন চাইছিলেন।
মান্নানদের এই কর্মসূচিতে ভিড় যে খুব বেশি হয়েছিল, তা নয়। কিন্তু যে ভাবে দলীয় পতাকা ছাড়াই বাম ও কংগ্রেসের নেতারা হাতে হাত ধরে পরিবর্তনের পরিবর্তন চেয়ে হেঁটেছেন, তাতে বেজায় খুশি তাঁরা। গণতন্ত্রের বদলে দলতন্ত্র এবং ধর্মের নামে ভোট পাওয়ার জন্য তৃণমূল নেত্রীর সঙ্কীর্ণ রাজনীতির প্রতিবাদ করেন কংগ্রেস নেতা নির্বেদ রায়, প্রাক্তন বিধায়ক শিখা মিত্র, ফুরফুরা শরিফের প্রতিনিধি ইব্রাহিম সিদ্দিকি প্রমুখ। জীবনে প্রথম এই রকম আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া অশোকবাবু সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন করেন, “আর কত দিন ভয় পাবেন? অন্যায় হলেই প্রতিবাদ করুন। প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।”