মাত্র দিন সাতেক আগেই রানাঘাটে রেললাইনের ধার থেকে মিলেছিল রবীন্দ্রভারতীর ছাত্রীর মৃতদেহ। এ বার মিলল কলকাতার বিধান রায় শিশু হাসপাতালের নার্সের দেহ।
রেলপুলিশ জানায়, মৃতার নাম ব্রজেশ্বরী দাস (২৫)। তাঁর বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর থানার বাজকুলে। তবে বেশির ভাগ সময়ে থাকতেন কলকাতার ফুলবাগানে। তাঁর ব্যাগ থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ পেয়েছে রেলপুলিশ। তবে তাতে কাউকে দায়ী করা হয়নি। রানাঘাট জিআরপি-র আইসি সুভাষ রায় বলেন, ‘‘প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, মেয়েটি রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে।’’
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি বিয়ে ঠিক হয়েছিল ব্রজেশ্বরীর। পরিবার সূত্রের খবর, ভাবী বরকে তিনি নিজেই পছন্দ করেছিলেন। পাত্রের বাড়ি পাশের ভূপতিনগর থানার কাকুরিয়া গ্রামে, চাকরি করেন ওড়িশার ভুবনেশ্বরে। তাঁদের আশীর্বাদও হয়ে গিয়েছিল। ব্রজেশ্বরীর ভাই সঞ্জয় চিনে ডাক্তারি পড়েন। দিদির বিয়ের জন্য তিনিও বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তের পরে পুলিশের অনুমান, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ রানাঘাট স্টেশনের ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে খানিকটা দূরে আপ শান্তিপুর লোকাল ট্রেনের সামনে তিনি ঝাঁপ দেন। নিজেদের প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করে রেলপুলিশকে খবর দেন কয়েক জন। ঝাঁপ দেওয়ার আগে তাঁকে কিছুক্ষণ প্ল্যাটফর্মে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছিল বলেও তাঁরা জানিয়েছেন। ব্রজেশ্বরীর ব্যাগ থেকে পাওয়া একটি ডায়েরি দেখে তাঁর বাড়ির লোকেদের খবর দেয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে বাবা সত্যজিৎ দাস, মা মলিনা দাস, কাকা শেখর দাস, ভাই ও কয়েক জন প্রতিবেশী রানাঘাটে জিআরপি থানায় এসে দেহ শনাক্ত করেন। রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে।
কেন এই ঘটনা, তার কোনও সূত্র অবশ্য মেলেনি। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলায় নিজের মাকে হারিয়েছিলেন ব্রজেশ্বরী। বাবা দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন। সেই সময় থেকেই ব্রজেশ্বরী ও তাঁর ভাই কাকিমার কাছে মানুষ। কিন্তু নতুন মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ ছিল না ব্রজেশ্বরীর। বরং তাঁর বাঁকুড়ায় নার্সিং পড়ার ক্ষেত্রে মলিনা দেবীরই বড় ভূমিকা ছিল। মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালে পরে নার্সিং ট্রেনিং নেন তিনি। তাঁর ভাইয়ের পড়ার খরচেরও বেশির ভাগ মা-ই জোগাতেন। কিন্তু বাবার সঙ্গে তেমন বনিবনা ছিল না মেয়ের। বিয়ের খরচ ও আনুষঙ্গিক কিছু বিষয় নিয়ে বাড়িতে মনোমালিন্য চলছিল বলেও পারিবারিক একটি সূত্রের দাবি।
বাড়ির লোকেরা জানান, রবিবার ব্রজেশ্বরী বাড়ি ফিরেছিলেন। মঙ্গলবার ফের কলকাতায় যান। মলিনাদেবী বলেন, ‘‘যত দূর শুনেছি, বুধবার সকালেও ও ডিউটি করেছে। বিকেলে ওর রুমমেটকে ‘নদিয়া যাচ্ছি’ বলে বেরিয়েছিল। এর বেশি কিছু বলেনি।’’ বিয়ে নিয়ে কি সংসারে কোনও অশান্তি ছিল?
মলিনাদেবীর দাবি, ‘‘বছরখানেক থেকে মেয়ের সঙ্গে ওই ছেলেটির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি মেয়েই আমাদের জানিয়েছিল। আমরা রাজি হয়ে যাই। পরিবারে সবাই এই বিয়ের কথা জানে।’’ শেখরবাবুও জানান, ব্রজেশ্বরীর মত নিয়েই বিয়ে ঠিক করা হয়। তাতে সে খুশিই ছিল। ফোনেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ছেলেটির সঙ্গে। রেলপুলিশ যে ‘সুইসাইড নোট’ পেয়েছে তাতেও সেই সুসম্পর্কেরই সাক্ষ্য রয়েছে। ব্রজেশ্বরী লিখেছেন, যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে খুব ভাল ছেলে। আশীর্বাদে পাত্রকে যে আংটি ও হার দেওয়া হয়েছিল, তা যেন ফেরত নেওয়া না হয়।