টিটাগড়ের ঘটনার পরে যাত্রী-সুরক্ষার হাল খতিয়ে দেখতে বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার। সঙ্গে ছিলেন পূর্ব রেলের কর্তারা। আর ছিল সশস্ত্র আরপিএফ। নিরাপত্তাকর্মীর ঘেরাটোপে থাকা রেলকর্তাদের সামনে ঘেঁষতে সাহস পাননি কেউ। কিন্তু জেনারেল ম্যানেজার চলে যেতেই সাহস সঞ্চয় করে স্টেশন মাস্টারের ঘরে ঢুকে পড়লেন কয়েকশো সাধারণ মানুষ। তাঁকে ঘিরেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে সমস্বরে বললেন, ‘শুধু স্টেশন কেন, স্টেশন সংলগ্ন এলাকা দিয়েই সন্ধ্যায় হাঁটাচলা করা যাচ্ছে না। মদ, গাঁজা, চরস, হেরোইন— সবই চলছে সারা দিন। আর চলছে নানা অসামাজিক কাজ। অবিলম্বে এ সব বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন।’
এই চেহারা শহরতলির প্রায় সব স্টেশনেরই। যাত্রীরা মনে করেন, রেল প্রশাসন নড়েচড়ে না বসলে ছবিটা পাল্টাবে না। এত দিন প্রশাসনিক নিয়ম দেখিয়ে কর্তারা যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি রাজ্য পুলিশের (জিআরপি) বলে দায়িত্ব এড়াতেন। তা আর মানতে নারাজ যাত্রীরা। তাঁদের দাবি— টিকিটের টাকা যখন রেলই নেয়, তখন যাত্রীদের সুরক্ষার দায়িত্ব রেলেরই। কী ভাবে সেই দায়িত্ব সামলাবেন, সেটা তাঁদেরই ভাবতে হবে। মঙ্গলবার ট্রেনে বোমা ফাটার ঘটনার পরে বহু নিত্যযাত্রীকেই এ দিন বলতে শোনা গিয়েছে, ভোর থেকে রাত স্টেশনগুলিতে কোনও রকম নিরাপত্তা আছে কি না, সেটাই বোঝা যায় না। তাঁদের অভিযোগ, ট্রেনে দূর অস্ত, প্ল্যাটফর্মেই দেখা মেলে না পুলিশের। কয়েকটি বড় স্টেশন বাদে শহরতলির বেশির ভাগ স্টেশনেই আরপিএফ বা জিআরপি আউট পোস্টই নেই। এমনিতেই শহরতলির বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্টেশনগুলি ক্রমশই দখল হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামতেই প্ল্যাটফর্মে আড্ডা বসাচ্ছে বহিরাগতেরা। কিছু স্টেশনের গেটে বাইক দাঁড় করিয়ে জমছে আড্ডা। একটু অন্ধকার এলাকাগুলিতে মাদকের নেশা বা মদ্যপানের আসর বসছে বলেও অভিযোগ।
জিআরপি কর্মীরা বলছেন, ‘‘কী বলব? বলতে গেলেই এক-এক জন এলাকার এক-এক দাদার নাম করে শাসাচ্ছে।’’ আর রেলকর্তাদের একাংশ বলছেন, জিআরপি যদি যাত্রীদের ঠিকমতো নিরাপত্তা দিতে না পারে, রেল প্রশাসন রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করুক। কারণ, জিআরপি-র জন্য রাজ্য সরকার রেলের কাছ থেকে টাকা পায়। জিআরপি কর্মীরা কিছু বাড়তি সুবিধাও পান রেলের কাছে।
বিভিন্ন এলাকায় বারবার ট্রেনের ভিতরে হামলায় এমনিতেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে যাত্রীদের। টিটাগড়ের ঘটনা গোদের উপরে বিষফোঁড়া। তাই যাত্রী-নিরাপত্তার বিষয়টি এ দিন সংসদেও উঠেছে। সরব হয়েছেন প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী অধীর চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘‘ট্রেনই বাড়ছে। যাত্রী-সুরক্ষা বলতে কিছু নেই। দুষ্কৃতীরা কামরার মধ্যে মারামারি করছে আর তার খেসারত দিচ্ছেন যাত্রীরা!’’
তবে টিটাগড়ের ঘটনার পরে নড়েচড়ে বসেছে রেল প্রশাসনও। পূর্ব রেলের তরফে জানানো হয়েছে, জিএম এ দিন রেল অফিসারদের নির্দেশ দেন, শহরতলির (হাওড়া ও শিয়ালদহ) কোন কোন স্টেশনে যাত্রীদের বেশি বিপদের আশঙ্কা রয়েছে, তা শীঘ্র চিহ্নিত করতে। তার পরে ওই সব স্টেশনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর জন্য রেলকর্তাদের একটি দলও তৈরি করা হয়েছে।