মায়ের গর্ভে নয়, জরায়ুর বাইরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল ছোট্ট রিউ। তা-ও আবার মায়ের অজান্তেই! চিকিৎসার জগতে এমন ঘটনা এতই বিরল যে, প্রতি ৩০ হাজারে একটি ক্ষেত্রে এমন গর্ভাবস্থা দেখা যায়। সেই শিশুর বাঁচার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ— সারা বিশ্বে প্রতি ১০ লক্ষে একজন শিশু সুস্থ অবস্থায় জন্মায়। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখাল ক্যালিফোর্নিয়ার খুদে।
রিউ— সুজ়ে লোপেজ় আর অ্যান্ড্রু লোপেজ়ের চার মাসের শিশুপুত্র। চলতি বছরের অগস্ট মাসে জন্ম তার। অথচ রিউয়ের জন্মের দিন কয়েক আগেও সুজ়ে জানতেন না, তিনি অন্তঃসত্ত্বা! ক্যালিফোর্নিয়ার বেকার্সফিল্ডের বাসিন্দা সুজ়ে পেশায় নার্স। ৪১ বছর বয়সি সুজ়ে তরুণী বয়স থেকেই জরায়ুতে একাধিক সিস্টের সমস্যায় ভুগছেন। কয়েক বছর আগে অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয়েছে ডানদিকের ডিম্বাশয়। সিস্টের অস্ত্রোপচারও হয়েছে বার কয়েক। চলতি বছরের মাঝামাঝি যখন এ হেন সুজ়ের পেটের আকার ফের বড় হতে থাকে, প্রথমে সিস্ট ভেবে তিনি বিষয়টিকে তেমন আমল দেননি। ভেবেছিলেন, অস্ত্রোপচার করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তা ছাড়া, গর্ভাবস্থার অন্য কোনও লক্ষণও ছিল না তাঁর শরীরে। কিন্তু যত দিন যায় সুজ়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ওজন বেড়ে যায় প্রায় ১০ কেজি। শেষমেশ ডাক্তারের কাছে যেতেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় সকলের। জানা যায়, সুজ়ে আদতে ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তবে এত দিন তা বোঝা যায়নি। যাবেই বা কী করে! ভ্রূণটি তো জরায়ুতে নেই, রয়েছে লিভারের কাছে অ্যামনিওটিক থলিতে।
আরও পড়ুন:
বিপজ্জনক এই গর্ভাবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় এক্টোপিক গর্ভাবস্থা, যেখানে জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে ভ্রূণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরণের ভ্রূণ ফ্যালোপিয়ান টিউবে বেড়ে ওঠে। ঠিক সময়ে সেটি অপসারণ না করা হলে অত্যধিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে মায়ের। আর এ ধরনের ভ্রূণের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও কম। যদি কোনও ভাবে শিশু ভূমিষ্ঠও হয়ে যায়, তা হলেও এ ভাবে জন্মানো প্রতি পাঁচ জন শিশুর মধ্যে এক জনের ক্ষেত্রে জন্মগত নানা ত্রুটি দেখা যায়। রিউয়ের বাবা অ্যান্ড্রুর কথায়, ‘‘গোটা সময়টা জুড়ে আমি বাইরে থেকে নিজেকে শান্ত দেখানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করছিলাম না। প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল, কারণ আমি জানতাম যে কোনও সময় আমি আমার স্ত্রী বা সন্তানকে হারাতে পারি।’’ কিন্তু সুজ়ের বেলায় সে সব কিছুই হয়নি। সমস্ত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৮ অগস্ট জন্ম নেয় ৩.৬ কেজি ওজনের রিউ— সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে! সেরে ওঠেন সুজ়েও।
শুনতে সহজ মনে হলেও গোটা বিষয়টা মোটেও এত সহজ ছিল না। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেডার্স-সিনাইয়ের প্রসূতি বিভাগের মেডিক্যাল ডিরেক্টর তথা চিকিৎসক জন ওজ়িমেকের বলছেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা এতই বিরল যে আমরা একটি মেডিক্যাল জার্নালে এই ঘটনাটি সম্পর্কে লেখার পরিকল্পনা করছি!’’ ওজ়িমেক জানাচ্ছেন, প্রতি ৩০ হাজারে একটি ক্ষেত্রে এ রকম গর্ভাবস্থা দেখা যায়। গর্ভাবস্থা পূর্ণ মেয়াদ অবধি পৌঁছোনোর সম্ভাবনা আরও কম— ১০ লক্ষে একবার এমন বিরল ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। তবে সে সব নিয়ে আর ভাবছেন না লোপেজ় দম্পতি। আর খুদে রিউও? সে আজকাল ১৮ বছর বয়সি দিদি কাইলার সঙ্গে খেলতেই ব্যস্ত থাকে। আর ছেলের দিকে তাকিয়ে সুজ়ে বলে ওঠেন, ‘‘আমাদের পরিবার যেন এত দিনে সম্পূর্ণ হল! আমি অলৌকিকে বিশ্বাস করি। ঈশ্বর নিজেই আমাদের এই অলৌকিক উপহার দিয়েছেন— সর্বকালের সেরা উপহার!’’