পশ্চিম এশিয়ার অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে একটিও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল না চিনের। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে এই সংঘর্ষের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বেজিংই, মনে করছে দিল্লির কূটনৈতিক মহল।
ইরান এবং আমেরিকার সংঘর্ষবিরতির মাঝে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন পক্ষ থেকেই। অবশ্যই অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। কিন্তু যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, আসল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের পুনর্গঠন ও সংস্কার। সেখানে চিন যে বড় আকারে প্রবেশ করবে, এমন ইঙ্গিত এখনই পাওয়া যাচ্ছে। ইসলামাবাদকে দিয়ে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতা করানোর পিছনেও রয়েছে বেজিং— এমন তথ্যও সামনে আসছে। কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউরোপে এ ভাবেই প্রবেশ করেছিল আমেরিকা। চিনের মন্দা অর্থনীতির মরসুমে সে দেশের সরকারের কাছে এটা একটা বড় সুযোগও বটে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি নিজেদের নতুন করে সাজাবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির জেরে। সেটা চিনের বিপুল শিল্প-ভিতের জন্যও সুখবর। যুদ্ধ এখনও কিছু ব্যবসার জন্য সুযোগ তৈরি করে।
প্রসঙ্গত ইরান সংঘাতের ফলে তৈরি হওয়া নতুন বাজারের সুযোগ ভারতও নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে যথেষ্ট ইঙ্গিতও বিদেশ মন্ত্রকের কর্তারা দিয়েছেন। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ার রাষ্ট্রগুলির কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে ইজ়রায়েলের সুরক্ষা ওয়াশিংটনের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, আরব রাষ্ট্রগুলির নিরাপত্তা ততটা নয়। অদূর ভবিষ্যতে এখানকার পরিবর্তিত সুরক্ষা পরিস্থিতিতে ভারত আরও বেশি করে সংলগ্ন হতে চাইবে। পাশাপাশি ভেঙে পড়া তেল এবং শক্তি ক্ষেত্রের পরিকাঠামোগুলির পুনর্নির্মাণ এবং মেরামতির কাজেও ভারতীয় সংস্থাগুলি ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু আপাতত এ কথা বললেও চিনের মতো বৃহৎ শক্তি যদি প্রতিযোগিতায় নামে, নয়াদিল্লি সেখানে কতটা লাভ তুলতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
পাশাপাশি এটাও মনে করা হচ্ছে, এই সংঘাত বন্ধ করতে কূটনৈতিক দৌত্য নয়, অর্থনীতি ও বাণিজ্যই বড় ভূমিকা নিতে চলেছে। দেখা যাচ্ছে যে, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে চার বছর ধরে এবং এখন তা আন্তর্জাতিক সচেতনতার আড়ালে চলে গিয়েছে। অথচ ইরান এবং আমেরিকার সংঘাত এক মাস চলার পরই তাকে বন্ধ করানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তৈরি হচ্ছে। তার প্রধান কারণ হল, শত বর্বরতা সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সে ভাবে ধাক্কা খাচ্ছে না। রাশিয়ার তেল সরবরাহ বহাল রয়েছে, বরং দাম কিছুটা কমেছে। ইউক্রেনের শস্য রফতানির ক্ষেত্রটিও অটুট রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সেই ধাক্কা সামলে নিতে পেরেছে।
অন্য দিকে ইরান আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গতিপথকেই অবরুদ্ধ করে রেখেছে। হরমুজ় প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। ইরান তাকে আটকানোয় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। আমেরিকাতেও মুদ্রাস্ফীতি এই মাসে অভূতপূর্ব ভাবে ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের সামনে বিরাট সুযোগ এসে গিয়েছে ট্রাম্প তথা রিপাবলিকান সরকারকে নিশানা করার। ভূকৌশলগত রাজনীতি নয় ভূঅর্থনীতিই শাসন করছে আজকের বিশ্বকে। সেটা যতই প্রমাণ হচ্ছে, চিনের সামনে সুযোগ ততই বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)