৪০ হাজারের মতো লোক বাস করত শহরটাতে। সংখ্যাটা কমতে শুরু করেছে দ্রুত। শহর ছেড়ে কেউ কোথাও যাচ্ছেন না। যাওয়ার উপায়ও নেই। কিন্তু রোজ হু হু করে কমে যাচ্ছে জনসংখ্যা। শহরটাতে খাবারের গাড়ি শেষ বার ঢুকেছিল অক্টোবর মাসে। তার পর আর ঢুকতে পারেনি। অনাহারে শুকিয়ে যেতে যেতে ঘরে ঘরে এখন নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষা। কেউ জানেন না, আর ক’টা দিন তাঁর জন্য বরাদ্দ রয়েছে এই পৃথিবীতে।
শহরটার নাম মাদায়া। খনিজ তেলে সমৃদ্ধ সিরিয়ার অন্য সব শহরের মতোই মাদায়াতেও স্বচ্ছল জীবন ছিল নাগরিকদের। কিন্তু আইএস-এর সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই শুরু হওয়ার পর সব বদলে গিয়েছে। গৃহযুদ্ধে দীর্ণ দেশেও কোনও রকমে জীবন কাটছিল। কিন্তু অক্টোবরের পর থেকে সব থেমে গিয়েছে। সরকারি বাহিনীর হাত থেকে শহরটাকে মুক্ত করতে না পেরে মাদায়ার সব দিকে ল্যান্ডমাইন বিছিয়ে দিয়েছে আইএস। ফলে শহর থেকে মাসের পর মাস কেউ বাইরে যেতে পারছেন না। বাইরে থেকে কোনও গাড়ি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বা খাবার নিয়ে শহরে ঢুকছেও না।
বেশ কিছু দিন আগেই মাদায়ায় খাবারের শেষ দানাটাও ফুরিয়ে গিয়েছে। ঘরে ঘরে অনাহারে মৃত্যু। না খেতে পেয়ে সর্বাগ্রে মৃত্যু হচ্ছে শিশুদের। মা-বাবার চোখের সামনে দিনের পর দিন না খেয়ে অল্প অল্প করে শুকিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। অসহায় ভাবে নিজেদের সন্তানকে মরতে দেখছেন মা-বাবা। সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে সামনে আসা একটি ভিডিওতে, ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে দেখা গিয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবারকে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বছর সাতেকের একটা হাড় জিরজিরে ছেলেকে। চামড়ার পাতলা আস্তরণের তলা থেকে বাইরে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের সব ক’টা পাঁজর। তাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, ‘‘শেষ কবে খেয়েছো?’’ শিশুর জবাব, ‘‘সাত দিন আগে।’’ আবার প্রশ্ন, ‘‘সত্যি বলছ?’’ হাড় জিরজিরে শিশু বলছে, ‘‘ঈশ্বরের দিব্যি বলছি।’’
আরও একটি পরিবারের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওতে। এক বছরেরও কম বয়সের একটি শিশুকে দেখা যাচ্ছে সেখানে। ছোট্ট শরীরটার সর্বত্র ছাপ ফেলেছে দীর্ঘ অনাহার। মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে গোঙানির আওয়াজ। শিশুর মা বললেন, ‘‘অনেক দিন দুধ জোগাড় করতে পারিনি।’’ প্রশ্ন এল কত দিন? মা জানালেন, ‘‘এখন ১০ দিন অন্তর এক বার দুধ দিতে পারছি।’’ বাকি দিনগুলো কী খাওয়াচ্ছেন? মা বললেন, ‘‘নুন আর জল খাওয়াচ্ছি।’’ মা জানেন না, নুন-জল খাইয়ে আর ক’দিন টিকিয়ে রাখতে পারবেন ছোট্ট প্রাণটাকে। নিজেও মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছেন। বুঝে গিয়েছেন, মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। শুধু বুঝতে পারছেন না, কার পালা আগে আসবে?
আর পড়ুন : হাওড়ায় অপুষ্টির লাল তালিকায় অঙ্গনওয়াড়ির ১০৭৫টি শিশু