E-Paper

বাজার আগুন, মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক আর অবিশ্বাস

ইরানের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বোমারু বিমান ঢুকলে সেখানকার সাধারণ মানুষ এই চ্যানেলকে জানাচ্ছে যে, হামলা হতে চলেছে।

মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৮
লস অ্যাঞ্জেলেসে।

লস অ্যাঞ্জেলেসে। ছবি: সংগৃহীত।

শিরিন এবং জাফর (নিরাপত্তার কারণে আসল নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না) তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে কানাডা থেকে ডক্টরেট করেন। এখন ম্যাসাচুসেটসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’জনেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। আজ শেষ কিস্তি।

আনন্দবাজার: এ বার আসি যুদ্ধের প্রসঙ্গে।

জাফর: আমার বাবা-মা এবং বোনের পরিবার তেহরানে। ইন্টারনেট নেই, ওঁরা ফোন করেন কলিং কার্ড দিয়ে। ওঁদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারছি, অবস্থা খুবই কঠিন। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে আর অবিশ্বাসে দিন কাটাচ্ছেন। দোকান বাজার খোলা আছে। খাবারও আছে। কিন্তু সব কিছুর অগ্নিমূল্য। একমাসে প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে সাধারণ মানুষ খুবই সঙ্কটে। হু হু করে জিনিসের দাম বাড়ছে।

আনন্দবাজার: আক্রমণ হতে পারে কি না, সেটা সাধারণ মানুষ আগে থেকে জানতে পারেন?

শিরিন-জাফর: সরকার জানাবে? এই সরকার? না। দেশের মানুষ তাই উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাচ্ছে। সমাজমাধ্যম টেলিগ্রামের একটি চ্যানেল ইরানের জটিল অন্তর্জালের মধ্যে ঢুকতে পেরেছে। কয়েক বছর আগে বাধ্য হয়ে ইরান ছেড়েছিলেন এক সাংবাদিক। তিনিই এই টেলিগ্রাম চ্যানেলটি চালান। এই চ্যানেলের মাধ্যমেই দেশের মানুষ যুদ্ধের খবর জানাচ্ছে এবং নিজেরাও জানতে পারছে। যেমন, ইরানের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বোমারু বিমান ঢুকলে সেখানকার সাধারণ মানুষ এই চ্যানেলকে জানাচ্ছে যে, হামলা হতে চলেছে। চ্যানেলটি তখন সেই খবর কোনও ভাবে যাচাই করে তেহরানবাসীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। মানুষ ১৫-২০ মিনিট সময় পাচ্ছে, যাতে তারা সুবিধাজনক শেল্টারে পৌঁছে যেতে পারে।

আনন্দবাজার: তা হলে খুবই ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন ওঁরা?

শিরিন-জাফর: হ্যাঁ, খুবই। হামলার খবর পেলেই উৎকণ্ঠায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আজ বলছে যুদ্ধবিরতি। কাল ফের আক্রমণ করছে। এক দিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বললেন সেতু ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আক্রমণ করবেন। সভ্যতা ধ্বংস করে দেবেন। সে দিন কী অসম্ভব আশঙ্কায় কাটিয়েছিলাম। ফোনে মায়ের গলাতেও ছিল আতঙ্ক। ওঁরা এখন শোয়ার ঘরে ঘুমোতে পারেন না, বাড়ির করিডরে, জানলা থেকে দূরে, ঘুমোন। এ ভাবেই চলছে ওঁদের।

আনন্দবাজার: কী ভাবছেন এই সময়ে দাঁড়িয়ে?

শিরিন-জাফর: আমরা তো এখন আর ফিরে যেতে পারব না। ওখান থেকে খবর না পেলে খবর পাওয়ারও কোনও উপায় নেই। অসম্ভব আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছি। সব সময়ে ভাবছি, প্রিয়জনদের কোনও ক্ষতি হবে না তো!

আনন্দবাজার: মানুষজন কি তেহরান থেকে পালাচ্ছে?

জাফর: যাঁদের কাছে অর্থ আছে, তাঁরা উত্তর ইরানে চলে যেতে পারেন। সমস্যা হচ্ছে, সরকারি আধিকারিকেরা যেখানে, সেখানেই হামলা হচ্ছে। দিন কয়েক আগে আমার এক বন্ধুর ফ্ল্যাট ক্ষেপণাস্ত্র হানায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল। ভাগ্যিস, ওরা তখন সেই বাড়িতে ছিল না। আসলে ওই বাড়িতে একই তলায় রেভেলিউশনারি গার্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারও ফ্ল্যাট ছিল। আক্রমণটা তাদের করা হয়েছে। কিন্তু তার মাসুল দিতে হচ্ছে অন্য সাধারণ মানুষদের।

আনন্দবাজার: ইরান সরকার কী বলছেন দেশের লোকদের? আপনারা কী শুনছেন বাড়ির লোকদের থেকে?

শিরিন-জাফর: সরকার বলছে, তাদের কাছে প্রচুর অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন, এই সব রয়েছে। তাই আরও বহু দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সরকারের কোনও চিন্তা নেই।

আনন্দবাজার: পরিস্থিতি কি আরও খারাপ হতে পারে?

শিরিন-জাফর: সেই আশঙ্কাতেই দিন কাটাচ্ছি আমরা। স্কুল আবার বন্ধ। ইন্টারনেট পরিষেবাও নামমাত্র। সাধারণ মানুষ ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে চলেছেন। আশা করি, সেই পরীক্ষায় আমরা পাশ করে যাব।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Los Angeles

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy