ব্রিটেনের প্রাক্তন যুবরাজ অ্যান্ড্রুকে (বর্তমান নাম অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর) বৃহস্পতিবার সান্ড্রিংহাম প্যালেস থেকে গ্রেফতার করেছে টেম্স ভ্যালি পুলিশ। এই সংক্রান্ত বিবৃতিতে অ্যান্ড্রুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং তাঁকে ‘ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটেনের রাজ পরিবারের বিতর্কে বার বার অ্যান্ড্রুর নাম উঠে এসেছে। আমেরিকান যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কারও আর অজানা নয়। সম্প্রতি আমেরিকার বিচার বিভাগ এপস্টিন ফাইলের কিছু অংশ প্রকাশ করায় তাঁর সঙ্গে অ্যান্ড্রুর ঘনিষ্ঠতার আরও নজির প্রকাশ্যে এসেছে। ফাঁস হয়েছে দুই ‘বন্ধু’র ইমেল কথোপকথন। অভিযোগ, অ্যান্ড্রুর মনোরঞ্জনের জন্য মডেল পাঠাতেন এপস্টিন। এমনকি, মডেল পাঠানো হয়েছিল খাস বাকিংহাম প্যালেসেই!
ব্রিটেনের আইন অনুযায়ী, কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন না-হওয়া পর্যন্ত তাঁর নাম প্রকাশ করতে পারে না পুলিশ। তাঁকে গ্রেফতার করা হলেও নয়। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ড এবং ওয়েল্সের পুলিশের জন্য এই নিয়ম চালু হয়েছিল। বৃহস্পতিবার অ্যান্ড্রুকে গ্রেফতার করলেও সেই নিয়ম মেনেই তাঁর নাম প্রকাশ্যে আনা হয়নি পুলিশের তরফে। তবে সত্য চাপা থাকেনি। ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অ্যান্ড্রুকে হেফাজতে নিয়েছে টেমস্ ভ্যালি পুলিশ। তল্লাশি চলছে নরফক এবং বের্কশায়ারের কয়েকটি ঠিকানায়। গ্রেফতারির কারণ হিসাবে পুলিশ যা উল্লেখ করেছে, তাতে কোথাও এপস্টিনের উল্লেখ নেই। বলা হয়েছে, সরকারি পদে থেকে অসদাচরণ করার সন্দেহে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কী করেছিলেন অ্যান্ড্রু? এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কবে থেকে? কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁরা? মার্কিন নথিতে তার ইঙ্গিত রয়েছে।
মডেল-জোগান
যৌন অপরাধের মামলায় এপস্টিনকে প্রথম দোষী সাব্যস্ত করা হয় ২০০৮ সালে। ১৩ মাস জেল খেটেছিলেন তিনি। ইমেলের তথ্য বলছে, এপস্টিন এই দফায় জেল থেকে বেরোনোর পরেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন খোদ অ্যান্ড্রু! ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের একটি কথোপকথনে দেখা যাচ্ছে, বাকিংহাম প্যালেসে এপস্টিনের সঙ্গে নিরালায় নৈশভোজের পরিকল্পনা করেছিলেন তৎকালীন যুবরাজ। আচমকা ইমেলে সেই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তনের প্রস্তাব আসে। এপস্টিন জানান, তাঁর কাছে এক রাশিয়ান মডেল-সহ তিন মহিলা আছেন। লেখেন, ‘‘আমি কি এদের সকলকে আনব? নৈশভোজ আরও প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য?’’ অ্যান্ড্রু সম্মতি দেন। পরে এপস্টিন ওই নৈশভোজে এক ‘কিউট রোমানিয়ান’কেও আনার কথা জানান। পরের দিন আবার লেখেন, ‘‘দারুণ মজা হল। পরে আরও হবে।’’ জবাবে অ্যান্ড্রু লেখেন, ‘‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই!’’
অস্বস্তিতে বাকিংহাম প্যালেস
যৌন অপরাধীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য অ্যান্ড্রুর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে ব্রিটেনের রাজ পরিবার। কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। ভাই অ্যান্ড্রুর জন্য রাজা তৃতীয় চার্লসকে অপমানিত হতে হচ্ছে। ব্রিটেনের রাজা কিংবা রাজ পরিবারকে শেষ কবে এমন অস্বস্তির মুখে পড়়তে হয়েছে, কেউ মনে করতে পারছেন না। অ্যান্ড্রুর গ্রেফতারির পর বিবৃতি দিয়েছেন রাজা চার্লস। জানিয়েছেন, তিনি এই সংবাদে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’। আইন আইনের পথে চলবে এবং তদন্তে তিনি সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত।
অ্যান্ড্রুর সাফাই
অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ তুলেছিলেন ভার্জিনিয়া জিওফ্রে নামের এক মহিলা। দাবি করেছিলেন, যুবরাজ তাঁকে একাধিক হার হেনস্থা করেছেন। তখন থেকেই এপস্টিনের সঙ্গে অ্যান্ড্রুর যোগ প্রকাশ্যে এসেছিল। শোনা যায়, ২০২২ সালের এই মহিলার সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করেছিলেন অ্যান্ড্রু। লক্ষ লক্ষ ডলারে সেই সমঝোতা হয়েছিল। টাকার অঙ্ক প্রকাশ্যে আসেনি। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, রাজ পরিবার থেকেই এই টাকার জোগান দেওয়া হয়েছে। বাকিংহাম প্যালেস এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ইমেল নিয়ে অ্যান্ড্রুকেও কিছু বলতে শোনা যায়নি। তবে এর আগে তিনি এপস্টিন সংক্রান্ত অভিযোগ প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন। ২০১৯ সালে বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যান্ড্রু দাবি করেন, ২০১০-এর শুরুর দিকেই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা ছিল না। ফলে নিজের কৃতকর্মের জন্য তিনি অনুতপ্তও নন। এর পরপরই রাজ পরিবার তাঁকে ‘শাস্তি’ দেয়।
তৃতীয় ব্যক্তি
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা নথিতে দাবি, জেল থেকে বেরোনোর পর ব্রিটেনের যুবরাজকে আর্থিক সহায়তা করেছিলেন এপস্টিন। এমনকি, সাহায্য পান অ্যান্ড্রুর প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসনও। বিবাহবিচ্ছেদ হলেও সারা এবং অ্যান্ড্রুর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। এপস্টিন তাঁদের নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা বলে দিয়েছিলেন। পরিবর্তে নানা ভাবে রাজকীয় যোগাযোগের সুবিধা নিতেন এপস্টিন। অভিযোগ, বিতর্ক বেড়ে যাওয়ার পর এপস্টিনের সঙ্গে অ্যান্ড্রু সরাসরি ইমেল চালাচালি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যোগাযোগ রাখতেন ডেভিড স্টার্ন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে। অ্যান্ড্রুকে কিছু বলার থাকলে এপস্টিন স্টার্নকে ইমেল করতেন। অ্যান্ড্রুর উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল এই যুবককে। তিনি একাধিক বিদেশ সফরে যুবরাজের সঙ্গী হয়েছিলেন। স্টার্ন বা সারা কেউই এই সমস্ত অভিযোগ সম্বন্ধে মন্তব্য করতে চাননি।
সম্পর্কের সাতকাহন
সূত্রের খবর, এপস্টিনের সঙ্গে ১৯৯৯ সাল থেকে অ্যান্ড্রুর আলাপ। এপস্টিন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেই তাঁর কাছে অ্যান্ড্রুর ঠিকানা থেকে মেল যায়, ‘‘অনেক দিন হয়ে গেল।’’ এপস্টিনের প্যারিসের আবাসনটি সপ্তাহান্তে ব্যবহার করা যায় কি না, অনুমতি চেয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। অনুমতি পেয়েও গিয়েছিলেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ১৯৯৬ সালে অ্যান্ড্রু এবং সারার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। কিন্তু এপস্টিন জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর যাঁরা প্রথমেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সারা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ব্যবসায় সাহায্য চেয়ে এপস্টিনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ব্রিটেনের প্রাক্তন যুবরাজের প্রাক্তন স্ত্রী। স্টার্নের মাধ্যমে মার্কিন সংস্থা জেপি মর্গানের আধিকারিকদের সঙ্গেও এপস্টিনের যোগাযোগ হয়েছিল বলে অভিযোগ। ওই সংস্থা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চায়নি।
ইমেল চালাচালি
২০১০ সালে বাকিংহাম প্যালেসে চার মডেলকে নিয়ে যাওয়ার মাস চারেক আগে এপস্টিন অ্যান্ড্রুকে আর একটি ইমেলে লিখেছিলেন, ‘‘আমার এক বন্ধু আছে। মনে হয় তাঁর সঙ্গে তুমি নৈশভোজ উপভোগ করবে।’’ জবাবে অ্যান্ড্রু বলেন, ‘‘আমি তাঁকে দেখার জন্য উচ্ছ্বসিত।’’ এই ‘বন্ধু’র ব্যাখ্যাও দেন এপস্টিন। ইমেলেই জানান, ২৬ বছরের রাশিয়ার তরুণী অত্যন্ত সুন্দরী এবং বিশ্বস্ত। অ্যান্ড্রুর ইমেলও তাঁর কাছে দেওয়া আছে বলে জানান তিনি। নৈশভোজের পরের দিন ওই তরুণী এপস্টিনকে ইমেলে লিখেছিলেন, ‘‘রাতটা দারুণ উপভোগ করেছি।’’
নিউ ইয়র্কের দিনগুলি
২০১০ সালে এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করতে এক সপ্তাহের জন্য নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। সেন্ট্রাল পার্কে একসঙ্গে ফ্রেমবন্দি হন তাঁরা। লন্ডনে ফিরে অ্যান্ড্রু জানিয়েছিলেন, নিউ ইয়র্কের দিনগুলি তিনি ‘মিস’ করছেন। বিতর্ক বাড়ছিল। কিন্তু প্রথমে তা পাত্তাই দেননি যুবরাজ। এপস্টিনকে লিখেছিলেন, ‘‘আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমরা আরও খেলব।’’ ২০১৩ সালেও স্টার্নের মাধ্যমে এপস্টিন-অ্যান্ড্রু যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। এপস্টিন লিখেছেন, ‘‘আমার এক অতি সুন্দরী বন্ধু লন্ডনে আসছে। অ্যান্ড্রু ওঁর সঙ্গে নৈশভোজ করতে ভাল লাগবে।’’ এর এক বছর পরে ২০১৯ সালের ১০ অগস্ট নিউ ইয়র্কের জেল থেকে এপস্টিনের দেহ উদ্ধার হয়।
অভিযোগ, এপস্টিনের হাতে ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি তুলে দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। ব্যবসার প্রয়োজনে এশিয়ার একাধিক দেশ নিয়ে এপস্টিন আগ্রহী ছিলেন। সেই সমস্ত দেশের সঙ্গে ব্রিটেন সরকারের যোগাযোগ, পরিকল্পনার গোপন নথি এপস্টিন পেয়েছিলেন সহজেই। এই অভিযোগের তদন্ত চলছে। জেল কর্তৃপক্ষের দাবি, এপস্টিন আত্মঘাতী হয়েছেন। তবে কেউ কেউ এই মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অ্যান্ড্রুর গ্রেফতারিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এল এপস্টিন পর্ব।