E-Paper

জানলাহীন কুঠুরিতে ‘বেআইনি’ অভিবাসী, চড়ছে প্রতিবাদী স্বর

অন্ধকারে সাধারণ মানুষই আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। শুরু হয়েছে এই ‘আইস ডিটেনশন সেন্টার’-এর সামনে প্রতিবাদ-অবস্থান। শুরু হয়েছিল দু’-এক জন দিয়ে। সেই সংখ্যা এখন সাতশোর বেশি।

মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩০
মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় অস্ত্র হাতে আমেরিকার অভিবাসী দফতরের নিরাপত্তারক্ষী।

মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় অস্ত্র হাতে আমেরিকার অভিবাসী দফতরের নিরাপত্তারক্ষী। — ফাইল চিত্র।

মিনিয়াপোলিস শহরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) বাহিনীর হাতে দু’জন আমেরিকান নাগরিক নিহত হওয়ার পরে প্রতিদিন মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় চলছে লাগাতার প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে আমেরিকার অন্যান্য শহরেও। এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং কোনও ভাবে জনজীবন বিঘ্নিত না করেই হয়ে চলেছে এই প্রতিবাদ। তাই প্রতিবাদীদের পাশে ক্রমশ এসে দাঁড়াচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। যাঁদের অনেকেই শ্বেতাঙ্গ।

শুধু মিনিয়াপোলিস নয়, ‘আইস’ হামলার আশঙ্কায় রয়েছে আমেরিকার বেশ কিছু প্রদেশ ও বড় শহরের প্রশাসন, যার মধ্যে ম্যাসাচুসেটসের রাজধানী বস্টনও রয়েছে। এই প্রদেশের বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের বেআইনি অভিবাসী অভিযোগে কাজের জায়গা, দোকান, বাজার ও স্কুলের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার পরে তাঁদের কোথায় রাখা হচ্ছে বা কেমন ভাবে রাখা হচ্ছে, তাঁরা কী ভাবে আছেন, তা সাধারণ মানুষের জানার সম্পূর্ণ বাইরে। আমার শহরের খুব কাছে বার্লিংটন শহরে ‘আইস’-এর একটি ফিল্ড অফিস আছে। একটি খুব সাধারণ বাড়ি, যা একদমই দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, সেখানে অভিযুক্ত অভিবাসীদের আটকে রাখা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। গত ডিসেম্বরে ম্যাসাচুসেটসের সেনেটর এড মার্কি এই বাড়িটিতে পরিদর্শনের জন্য গিয়েছিলেন এবং তার পরে তিনি জানান, কোনও পরিষেবা ছাড়াই, অত্যন্ত অমানবিক ভাবে আটকে রাখা হয়েছে এই মানুষদের। ছোট ছোট অস্বাস্থ্যকর, জানলাহীন ঘরে বহু মানুষকে একসঙ্গে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এমনকি, সেখানে কোনও চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই।

শুধু ম্যাসাচুসেটস-ই নয়, কানেটিকাট, মেন, নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো বিভিন্ন উত্তর-পূর্বের প্রদেশ থেকেই বেআইনি অভিবাসনের অভিযোগে অসংখ্য মানুষকে এই সেন্টারে তুলে আনা হচ্ছে। এই সেন্টারটি কিন্তু একটি জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য সাময়িক একটিব্যবস্থা হিসেবেই পরিকল্পিতহয়েছিল, দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখার জন্য নয়। কিন্তু এখন দেখাযাচ্ছে, কিছু মানুষকে কার্যত বন্দি করে রাখার জন্যই এই সেন্টারটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

জানুয়ারিতে পড়শি প্রদেশ মেন-এর পোর্টল্যান্ডে শহর থেকে এই সেন্টারে তুলে নিয়ে আসা হয় বেশ কিছু মানুষকে। কয়েক জনকে ছেড়ে দেওয়ার পরে তাঁদের আইনজীবী সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন, ওখানে কী অমানবিক অবস্থায় ‌তাঁদের রাখা হয়েছিল। আটক মানুষজনের কাছ থেকেই জানা যায়, একটি ছোট কুঠুরিতে চল্লিশ জনের বেশি মহিলাকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। ঘরে জানলা নেই। ঘর গরম রাখার কোনও ব্যবস্থাও নেই, অথচ, যাঁদের আটক করে রাখা হয়েছে, তাঁদের অনেকেরই সঙ্গে প্রয়োজনীয় গরমজামা বা মোজা ছিল না। সাধারণ স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে শুরু করে দরকারি ওষুধ— কোনও চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই। খাবারের মানওভীষণ খারাপ।

মনে রাখতে হবে, যাঁদের সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করা হচ্ছে, তাঁরা কেউ অপরাধী নন, শুধু বেআইনি অভিবাসী বলে অভিযুক্ত। এই অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় সমাজমাধ্যমে হইচই হওয়ার পরে কংগ্রেস-সদস্য ক্যাথরিন ক্লার্কও এই সেন্টারে গিয়েছিলেন। সেন্টারটি পরিদর্শনের জন্য তিনি আদালতের রায় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তবু তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হয়, জানুয়ারি মাসে হোমল্যান্ড সিকিওরিটি ঘোষণা করেছিল যে ‘আইস’ সেন্টারে যেতে গেলে সাত দিনের অগ্রিম নোটিস দিতে হবে। কংগ্রেস-সদস্য ক্লার্ক সে রকম কোনও অগ্রিম নোটিস দেননি। তাই তাঁকে সেন্টারটি ঘুরে দেখতে দেওয়া হয়নি। কংগ্রেস-সদস্যদের কিন্তু সাংবিধানিক অধিকার আছে, তাঁরা কোনও অগ্রিম ঘোষণা ছাড়াই এ রকম কোনও সেন্টারে ঢুকে সেখানকার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে পারেন এবং যাঁদের আটক করে রাখা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে কথাও বলতে পারেন।

তবে এ রকম অন্ধকারে সাধারণ মানুষই আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। শুরু হয়েছে এই ‘আইস ডিটেনশন সেন্টার’-এর সামনে প্রতিবাদ-অবস্থান। শুরু হয়েছিল দু’-এক জন দিয়ে। সেই সংখ্যা এখন সাতশোর বেশি। কখনও কখনও সংখ্যাটা হাজারও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদীরা সেন্টারের সামনে জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল আর অবস্থান করে তাঁদের প্রতিবাদ জানিয়ে চলছেন। তুষারপাত বা কঠিন শীতওএই প্রতিবাদীদের দমিয়ে রাখতে পারছে না।

এ ভাবেই চলছে প্রতিবাদ। বড় শহর থেকে ছোট শহরে। গণতন্ত্র আর মানবিকতা টিকিয়ে রাখার লড়াই জারি রাখতে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america USA

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy