হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিবাসন কাউন্টারে প্রশ্নোত্তরের পাট চুকিয়ে বাইরে পা রাখতেই ঢাকা ট্রাফিকের চিরন্তন কাঁইকিঁচির! কঠিন শ্রমে দিনাতিপাত করা এই হট্টমেলায় আগন্তুকের বোঝা দায়, বারুদের উপর বসে থাকা এই রাষ্ট্র ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আর তিন রাত পরেই— নিছক এই পাসওয়ার্ডে খোলা সম্ভব নয় ভোট জ্বরে ভোগা শহরটির জিপিএস। গত দেড় বছর সংঘাত, হত্যা, সাময়িক শান্তি, ফের ভাঙচুরের নাগরদোলায় চড়া সোনার বাংলা এখন আশা-আশঙ্কায় ভিতর থেকে থম মেরেও কি নেই? ভোটের অপেক্ষার সঙ্গে বাতাসে ভাসছে অনিশ্চয়তার বীজ। চব্বিশের বর্ষায় যে অভ্যুত্থানের শুরু তার পূর্ণবৃত্ত কি রচিত হবে এই বসন্তের গোড়ায়? না কি শেষ মুহূর্তে কোনও কাণ্ডে ভন্ডুল হবে ভোট? না কি ত্রিশঙ্কু হবে ফলাফল? এই প্রশ্নাপ্রশ্ন ঢাকার বাজারে ডাবের পানির মতোই আজ সহজলভ্য! গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সফেন দুধে পরতে পরতে সর পড়ে রয়েছে সন্দেহ,অবিশ্বাস, দ্বন্দ্বের।
কাওরন বাজারের ঘিঞ্জি সবজি বাজারের চা গলি থেকে গুলশান (এক)-এর অভিজাত কফিতন্ত্র-- সর্বত্র আপাতত লড়াই চলছে ইস্তাহার বনাম ইস্তাহারের। ভাষ্যের সঙ্গে ভাষ্যের। গোপন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রকাশ্য প্রচারের। পল্টনে কেমিকাল ব্যবসার পারিবারিক উত্তরাধিকারী মোজাম্মেল হুসেন পিন্টুর সঙ্গে গত মাসে ঢাকায় এসে বন্ধুত্বই হয়ে গিয়েছে। বিএনপি-র ছাত্রদল করতেন, এখন ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠায় সক্রিয় রাজনীতির সময় পান না, তবে ওঠাবসা করেন রাজনৈতিক বৃত্তে। বলছেন, “যত এই দেশে ঘুরবেন জামায়েতে ইসলামি এবং বিএনপি-র ইস্তাহার নিয়ে লড়াইটা চোখে পড়বে। অথচ উভয়েই বলছে দুর্নীতি রোধ, যুবা কর্মসংস্থান, গণতন্ত্রের মেরামতি, সংখ্যালঘুর সুরক্ষার কথা। তবে সূক্ষ্ম তফাৎ আছে। জামাত বলছে মৌলিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক খোলনলচে বদলানোর কথা। এই সংস্কারের আওতায় রয়েছে প্রশাসন, সংসদ, নির্বাচন, পুলিশি ব্যবস্থা, আদালত, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সংবাদমাধ্যম। অন্যদিকে বিএনপি নতুন বাংলাদেশ গড়ার থেকেও জোর দিচ্ছে মেরামতিতে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে ফের জাগিয়ে তোলা, সরকারের বিভিন্ন শাখায় নজরদারি বসানো, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, সংবিধানের পথে রাজনীতিকে ফেরানোর কথা বলছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবংতাঁর পার্টি।”
এক কথায়, জামায়েতে দিচ্ছে বাংলাদেশ ২.০-র ভাবনা। বিএনপি-র প্রতিশ্রুতি, বাংলাদেশ ১.০-কে শোধরানোর। ১৭ বছর পর দেশে ফেরা খালেদা জিয়ার পুত্র তারেকের উপস্থিতিতে অনেক নতুনত্ব দেখছেন বিএনপি-র শীর্ষ নেতৃবর্গ। গুলশন দুইয়ের নব্বই নম্বর সড়কে বিএনপি-র নির্বাচনী অফিসটিই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত সদর অফিস। ভোটের আগে কলকাতা বা দিল্লির কোনও বড় দলের অফিসের সামনে যে চিত্রটা দেখা যায় তার থেকে পৃথক কিছু নয় ছবিটা। টিকিট প্রত্যাশীর ভিড়টা কেবল কমে গিয়েছে। ঘুরছেন অসংখ্য সুযোগসন্ধানী ছোট বড় ব্যবসায়ী, জান কবুল করা কর্মী, ছাত্র বাহিনী, বিভিন্ন স্তরের নেতা ও ফড়ে। সংলগ্ন ছোট দোকানে বিক্রি হচ্ছে জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের পোস্টার, ধানের শিসের প্রতীক দেওয়া ব্যাজ। দলের নির্বাচন পরিচালন কমিটির অনেকের মুখেই একটা কথা শোনা গেল, (যা একটু ঘুরিয়ে শুনলাম অ্যাপ ক্যাবের চালকের মুখেও) তারেক বদলে দিয়েছেন প্রচারের মডেল। যে কোনও জেলা বা বিভাগে যাচ্ছেন তিনি, সেখানকার স্থায়ী কমিটির নেতাদের সবাইকে সার দিয়ে বসাচ্ছেন মঞ্চে। নিজে একটি হ্যান্ডস ফ্রি মাইক নিয়ে পায়চারি করতে করতে কথা বলছেন। একতরফা বক্তৃতা দেওয়া তো রয়েছেই, পাশাপাশি সংযোগ করছেন সামনের মানুষ, মঞ্চে বসা নেতাদের সঙ্গেও। বিএনপি-র এক নেতার বক্তব্য, ‘‘আপনাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমনটা করেন! ইউরোপের অনেক দেশেও ভোটের সময় নেতারা এমনটা করেন। আগে যা ছিল না। ওঁর মায়ের আমলেও দেখতাম শীর্ষ নেতারা আসতেন, নিজের নির্ধারিত আসনে বসতেন। নিয়ম মাফিক বক্তৃতার সময় উঠতেন এবং বক্তৃতা সেরে চলে যেতেন।’’
এখনও পর্যন্ত সমীক্ষায় এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। সমীক্ষাগুলির গড় ফলে বিএনপি একক ভাবে ১৬০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এরপর স্বতন্ত্র পার্টি এবং অন্যান্য ছোট দলগুলি মিলিয়ে ২০০-র কাছাকাছি বা তার সামান্য বেশি পৌঁছানোর কথা তারেকের। দিনে পাঁচটা করে জনসমাবেশ করছেন, ভাল সাড়াও পাচ্ছেন। কিন্তু জামাতের আইটি ব্রিগেড যেহেতু অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সর্বব্যাপী, তাই ভাইরাল হচ্ছে বিএনপি-র বিভিন্ন নেতার কুকীর্তি, কেচ্ছা। এ ছাড়া, ৬০ থেকে ৭০টি আসনে বিএনপি-র প্রার্থীদের সঙ্গে শরিক দলগুলির কাজিয়া চলছে। ফলে আসন কাটাকাটি হয়ে জামাতের লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ বিএনপি এবং তার শরিকদল উভয়েই প্রার্থী দিয়ে রেখেছে।
একটি আশঙ্কা বাংলাদেশে সর্বব্যাপ্ত, যে কোনও ভাবে নির্বাচনে ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি তৈরি করা হয় কি না। সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের মধ্যে কেউ কেউ (অবশ্যই সবাই নন) এবং বাইরের কিছু গোষ্ঠীও (যার মৌলবাদী 'মব'-এর নিয়ন্ত্রকও বটে) জামাতের আসন বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে সূত্র জানাচ্ছে। হিজবুল তাহরিরের মতো সংগঠন প্রকাশ্যেই মৌলবাদী পোস্টার দিচ্ছে, সমাজমাধ্যমেও সক্রিয়তা যথেষ্ট। দু’দিন আগেই ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ঘিরে ঢাকার হোটেলের সামনে পুলিশের সঙ্গে মঞ্চের নেতা–কর্মীদের সংঘর্ষ, অশান্তিকে মনে করাচ্ছেন অনেকেই। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে এবং এক পর্যায়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। প্রশ্ন উঠছে, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যদের অর্থের জোগান দিচ্ছে কে?
নানা সংশয় এবং দ্বিধার মধ্যেই দেখলাম ডিজেলে চলা ময়মনসিংহ খুলনাগামী ট্রেনের মাথায় বসেও পেটের ধান্দায় ঢাকায় আসা মানুষজন নিজ নিজ গ্রামে ফিরছেন। আগামিকাল থেকে ভোট উপলক্ষে দীর্ঘ তিন দিনের সার্বিক ছুটি। ভোট দিতে ফিরছেন তাঁরা। বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারে ক্রমশ বড় হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখটা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)