Advertisement
E-Paper

দরজা বন্ধ আমেরিকার, নিষিদ্ধ সাত দেশ, নিন্দার ঝড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প

শরণার্থীদের মুখের উপরে আমেরিকার দরজাটাই আপাতত বন্ধ করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তার পরেই পড়লেন ঘরে-বাইরে অসন্তোষের মুখে।

সংবাদ সংস্থা

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ ০২:৪২
সইয়ের পর। ট্রাম্পের ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ এই নির্দেশ ঘিরেই চলছে সমালোচনা। ছবি: রয়টার্স

সইয়ের পর। ট্রাম্পের ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ এই নির্দেশ ঘিরেই চলছে সমালোচনা। ছবি: রয়টার্স

শরণার্থীদের মুখের উপরে আমেরিকার দরজাটাই আপাতত বন্ধ করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তার পরেই পড়লেন ঘরে-বাইরে অসন্তোষের মুখে। কারণ, খাতায়-কলমে শরণার্থীদের কথা বললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে মুসলিমদেরই দূরে ঠেলার বন্দোবস্ত করলেন বলে মনে করছেন অনেকে।

বেআইনি অভিবাসী রুখতে মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার নির্দেশ ট্রাম্প দিয়েছেন দিন দুয়েক আগেই। গত কাল পেন্টাগনে আরও এক প্রস্ত প্রশাসনিক নির্দেশে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যার নির্যাস— ১) আপাতত আগামী চার মাস আমেরিকায় শরণার্থী ঢোকা বন্ধ। ২) সিরিয়া, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান এবং ইয়েমেনের মতো সাতটি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের নাগরিকদের আগামী ৯০ দিন আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। ৩) সিরিয়ার নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে অনির্দিষ্টকাল। চতুর্থ বোমাটা টিভি সাক্ষাৎকারে। ট্রাম্প বলেছেন, ভবিষ্যতে শরণার্থী নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন খ্রিস্টানদের।

ট্রাম্পের এই নির্দেশের সমালোচনায় আজ দিনভর মুখর থেকেছে সোশ্যাল মিডিয়া। বৈধ ভিসা নিয়েও কেন আমেরিকায় ঢোকা যাবে না— প্রশ্ন তুলেছে শিল্প-বাণিজ্য মহল। সহকর্মীদের উদ্দেশে ই-মেলে গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই জানিয়েছেন, ওই সাতটি দেশের অন্তত ১৮৭ জন কাজ করেন গুগলে। এই সিদ্ধান্তের মূল্য চোকাতে হবে তাঁদের পরিবারকেই। উপরন্তু এই নির্দেশের ফলে আমেরিকায় প্রতিভাবানদের আসা বন্ধ হয়ে যাবে বলেও তাঁরা মনে করছেন। ওই কর্মীদের মধ্যে যাঁরা এখন বিদেশে রয়েছেন, তাঁদের অবিলম্বে গুগলের সদর দফতরে ফিরতে বলা হয়েছে। বস্তুত, ট্রাম্প ওই নির্দেশে সই করার পরেই ইরাক ও ইরানের বেশ কয়েক জন নাগরিককে বিভিন্ন বিমানবন্দরে আমেরিকাগামী বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি বলে খবর। এমনকী আমেরিকায় নেমেও ফিরে যেতে হয়েছে অন্তত তিন জনকে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর বিদায়ী ভাষণে আমেরিকাকে ‘উদ্বাস্তু আর অভিবাসীর দেশ’ বলেছিলেন বারাক ওবামা। অথচ ট্রাম্প সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা রাখলেন না বলে মনে করেন ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকেরবার্গ। ফেসবুকেই তিনি লেখেন, ‘‘আমিও তো অভিবাসী পরিবারের ছেলে। সে ভাবে দেখলে, প্রশাসনের চোখে আমার অনেক সহপাঠীই অবৈধ অভিবাসী। কিন্তু আমরা প্রাণপণে আমেরিকাকে ভালবেসেছি। শরণার্থীদের জন্য দরজা খোলা রেখেও দেশকে নিরাপদ রাখা যায়!’’ শান্তির নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘‘যুদ্ধের মাটিতে পড়ে পড়ে মার খাওয়া শিশু ও তাদের বাবা-মায়েদের জন্য এ ভাবে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার কথা শুনেই মন ভেঙে গেল। সিরিয়ার বাচ্চাগুলোর তো কোনও দোষ ছিল না!’’

শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে এর আগে আপত্তি জানিয়েছে কিছু দেশ। কিন্তু ট্রাম্প যে ভাবে সাতটি দেশকে নিশানা করেছেন, তাতে ‘মুসলিম-বিদ্বেষই’ দেখছেন কূটনীতিকদের একাংশ। কারণ, আমেরিকায় মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে ভোটের প্রচারের শুরু থেকেই ট্রাম্প ছিলেন একবগ্গা। বিশ্বের সব মুসলিমকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দিতেও কসুর করেননি তিনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে গত কালই অস্কার অনুষ্ঠান বয়কটের ঘোষণা করেছিলেন ইরানের এক অভিনেত্রী। আজ ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানি বলছেন, ‘‘এটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সময়। দেওয়াল তোলার সময় নয়।’’ রাষ্ট্রপুঞ্জের আর্জি, সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনা করুক আমেরিকা। প্রতিবাদ জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও।

ট্রাম্প অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন সন্ত্রাস মোকাবিলার। বলেছেন, ‘‘আমরা ওঁদের চাই না। যে আতঙ্কটার সঙ্গে আমাদের সেনারা বিদেশে লড়ছেন, সেটাকে আমাদের দেশে ঢুকতে দেব না। যাঁরা আমাদের দেশকে সমর্থন করেন এবং মার্কিন জনতাকে ভালবাসেন, তাঁদেরই প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে।’’ ঘটনাচক্রে আজই টেলিফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেলের। শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা কুড়িয়েছিলেন যিনি!

অনেকে মনে করছেন, প্রশাসনিক নির্দেশে সই করলেও শীঘ্রই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। যদিও তাতে উদ্বেগ কমছে না। বরং প্রশ্ন উঠছে, চার মাস পরে কী হবে? যে আভাস মিলেছে, তা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। যেমন, নয়া নির্দেশিকা বলছে— আমেরিকায় প্রবেশাধিকার পেলেও উদ্বাস্তুরা কোনও এলাকায় বসবাস করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে সেখানকার মেয়র কিংবা গভর্নরের ওপর।

এমন সিদ্ধান্তে সংস্থার অন্তত ১৮৭ জন কর্মী ও তাঁদের পরিবার প্রভাবিত হবেন। শুধু তাই নয়, এর জেরে ভবিষ্যতে অনেক প্রতিভাও হারাবে আমেরিকা।

সুন্দর পিচাই | সিইও, গুগল

আমিও তো অভিবাসী পরিবারের ছেলে। কিন্তু প্রাণপণে আমেরিকাকে ভালবেসেছি। শরণার্থীদের জন্য দরজা খোলা রেখেও দেশকে নিরাপদ রাখা যায়। কিন্তু এটা কী হল!

মার্ক জুকেরবার্গ | ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা

শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে একটা গর্বের ইতিহাস ছিল আমেরিকার। সেটাই উল্টে গেল। সিরিয়ার বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর তো কোনও দোষ ছিল না!

মালালা ইউসুফজাই | শান্তির নোবেলজয়ী

উপরন্তু টিভি-সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘আগে মুসলিম মাত্রই এ দেশে সহজে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। আর খ্রিস্টান হলেই উল্টো। সিরিয়া-ইরাকের মতো দেশে খ্রিস্টানরা বঞ্চিত এবং নির্যাতিত। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’’ নিশ্চিন্তির উপায় নেই অভিবাসীদেরও। তাঁদের ভিসার যাচাই নিয়ে কড়াকড়ি যে বাড়তে চলেছে, সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। সংবাদমাধ্যম যদিও বলছে, গত বছর আমেরিকায় আসা মুসলিম ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের সংখ্যা প্রায় সমান— ৩৮ হাজারের আশপাশে। ঘুরেফিরে তাই আঙুল উঠছে ‘ট্রাম্পোচিত’ মুসলিম বিদ্বেষের দিকেই।

মার্কিন সেনাকে ঢেলে সাজার লক্ষ্যে অন্য একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকায় একই সঙ্গে সই করেন ট্রাম্প। সেই সময়ে প্রসঙ্গক্রমে তোলেন ৯/১১ হামলার কথা। আমেরিকার ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি হানা চালানো ওই ১৯ জন জঙ্গির বেশির ভাগই ছিল সৌদি আরবের। বাকিরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মিশর এবং লেবাননের। রহস্যজনক ভাবে ট্রাম্পের ‘হিট লিস্টে’ এই চারটি দেশের উল্লেখ পর্যন্ত নেই!

প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ সাংবাদিক বৈঠকে বারাক ওবামা বলেছিলেন, প্রয়োজন হলেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হবেন তিনি। হোয়াইট হাউসে এসেই ট্রাম্প হাত দিয়েছেন ‘ওবামাকেয়ার’ (স্বাস্থ্য বিমা) প্রকল্পে। সরেছেন ট্রান্স প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে। এ বার দরজা বন্ধ হল শরণার্থীদের। শান্তির নোবেলজয়ী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মুখ খুলবেন কি? মুখিয়ে মার্কিন মুলুক।

Donald Trump Immigration ban Social Media Blame muslim nations
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy