তাঁর বুধবারের বিবৃতির পরেই বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে এসেছে ‘গোল্ডেন ডোম’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন ‘বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’র জন্য কেন গ্রিনল্যান্ডকে বেছে নিতে চাইছেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। গত বছর ট্রাম্প এই বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ঢাল প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক ভাবে ১৭৫০০ কোটি ডলার (প্রায় ১৫ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি টাকা) বরাদ্দ করেছিলেন। ইতিমধ্যেই সেই কর্মসূচির অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে বলে আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের একাংশ জানাচ্ছে।
কী বলেছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ তাঁর পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘অপরিহার্য’। তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার প্রয়োজন। আমরা যে গোল্ডেন ডোম তৈরি করছি, তার জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার হাতে চলে গেলে নেটো অনেক বেশি শক্তিশালী এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।” গোল্ডেন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ১০০ শতাংশ নিশ্ছিদ্র বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘রোনাল্ড রেগনের জমানাতেই এমন পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখন এমন উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটেনি।’’
কী এই গোল্ডেন ডোম
পেন্টাগনের ‘হোমল্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স’ (অভ্যন্তরীণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা) এবং মহাকাশ নজরদারি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই ‘গোল্ডেন ডোম’। ভবিষ্যতে উত্তর মেরুবলয়ে রাশিয়া এবং চিনা ফৌজের সম্ভাব্য হামলার মোকাবিলা করাই এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য বলে প্রকাশিত কয়েকটি খবরে দাবি। ইজ়রায়েলি ‘আয়রন ডোম’ এবং রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার (যার ভারতীয় সংস্করণের নাম ‘সুদর্শন চক্র’) সঙ্গে মার্কিন গোল্ডেন ডোমের মূল ফারাক হল, ‘অবস্থানে’। ‘আয়রন ডোম’ এবং রুশ এস-৪০-র বহুস্তরীয় ব্যবস্থা মাটি থেকেই পরিচালনা করা হয়। গোল্ডেন ডোম নিয়ন্ত্রণ করা হবে মহাকাশ থেকে। এটি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মার্কিন মহাকাশ বাহিনী (স্পেস ফোর্স)-এর প্রধান জেনারেল মাইকেল গুয়েটলিন।
কী ভাবে কাজ করবে ‘সোনালি গম্বুজ’
এই পরিকল্পনায় মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার খানেক উপগ্রহ স্থাপন করা হবে। লেজ়ার অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত ওই উপগ্রহগুলি নিরন্তর নজরদারি চালাবে। পাশাপাশি, বিশ্বের যে কোনও প্রান্ত থেকে মার্কিন ভূখণ্ড বা সেনাঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসা শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র (বা যুদ্ধবিমান) আকাশেই ধ্বংস করতে পারবে। গোল্ডেন ডোমের আর এক বৈশিষ্ট্য হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ ও লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যবস্থা। শত্রুপক্ষের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের যদি জনবিরল স্থান বা সমুদ্র গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে ট্রাম্পের ‘সোনালি গম্বুজ’ নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে অর্থের সাশ্রয় হয়।
পরবর্তী প্রজন্মের হাইপারসনিক (শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ বা তার বেশি গতিবেগসম্পন্ন) ব্যালিস্টিক অন্তর্মহাবেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে চিহ্নিত করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরেই ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে গোল্ডেন ডোমের। এই উদ্দেশ্যে উপগ্রহগুলিতে বসানো হবে ‘ফ্র্যাকশনাল অডিটাল বম্বার্ডমেন্ট সিস্টেম’ (ফোবস) এবং অতি শক্তিশালী ‘সেন্সর’। যে প্রযুক্তির সাহায্যে মহাকাশ থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র (ওয়ারহেড) নিক্ষেপ করা সম্ভব।
কেন ট্রাম্পের নজরে ডেনমার্ক
ভবিষ্যতে রাশিয়া এবং চিন থেকেই আমেরিকার মাটিতে আকাশপথে হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে পেন্টাগনের। সে ক্ষেত্রে উত্তর মেরুবলয়ের ওই অঞ্চল সামরিক অবস্থানগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ তাই এমন ‘ক্ষেপণাস্ত্র বর্ম’ তৈরির উদ্যোগ। ২০৩৯ সালের মধ্যেই এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে জানিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের ইঙ্গিত, আগামী দু’দশকে এই প্রকল্পে মোট ৮৩১০০ কোটি ডলার (প্রায় ৭৬ লক্ষ কোটি টাকা) খরচ হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ডেনমার্কের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৫৬ হাজার জনসংখ্যার ‘বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ’ প্রায় ৩০০ বছর ধরে কোপেনহাগেন (ডেনমার্কের রাজধানী)-এর নিয়ন্ত্রণে। নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি পরিচালনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত দায়িত্ব দ্বীপটির স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ পালন করেন। আর বিদেশ এবং প্রতিরক্ষানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি নেয় ডেনমার্ক সরকার। দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে ট্রাম্প গত ১১ মাসে একাধিক বার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু প্রতি বারেই সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি একসঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু মার্কিন ভূখণ্ডের নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপে অবিচল ট্রাম্প।