পাকিস্তান এবং কাতারের মধ্যস্থতায় রবিবার সুইৎজ়ারল্যান্ডে বৈঠকে বসেছিল আমেরিকা এবং ইরান। প্রথম দফার বৈঠক হয়ে গিয়েছে। তবে তা কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথম দফার বৈঠক চলাকালীনই ইরানে ফের হামলার হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হুমকি দিয়েছেন সুইৎজ়ারল্যান্ডে যাওয়া ইরানি প্রতিনিধিদলকেও। ইরানি সংবাদমাধ্যম সূত্রে রয়টার্স জানাচ্ছ, ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন ইরানি প্রতিনিধিরা। ফের তাঁরা বৈঠকে বসবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানোর জন্য আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে একটি মউ আগেই স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই মউয়ে উল্লেখিত শর্তগুলি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করতেই রবিবার মুখোমুখি হয় দু’দেশ। আমেরিকার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। ইরানের প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে দেশের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সুইৎজ়ারল্যান্ডের বারগেনস্টকে এক পাহাড়ি রিসর্টে প্রথমে মধ্যস্থতাকারী দুই দেশ— পাকিস্তান এবং কাতারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একপ্রস্ত বৈঠক হয়। প্রায় ৮০ মিনিট ধরে ওই বৈঠক চলার পরে ‘অভ্যন্তরীণ আলোচনার’ জন্য একটি বিরতি নেওয়া হয়। এর পরে আমেরিকা এবং ইরানের দ্বিপাক্ষিক স্তরে বৈঠক শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে ইরানি সূত্রে খবর ছড়ায়, ট্রাম্পের হুমকির জেরে বৈঠক থমকে গিয়েছে।
রবিবার বৈঠক শুরুর আগে পরিস্থিতি এতটা ‘জটিল’ ছিল না। সুইৎজ়ারল্যান্ড বৈঠকের মূল পর্ব শুরুর আগে প্রাথমিক আলোচনায় ইরানের সঙ্গে শান্তির বার্তা দেন ভান্স। জানান, ইরানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের এক ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চাইছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্টও তেমনটাই চাইছেন বলে জানান তিনি। ভান্সের কথায়, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে এক ‘মৌলিক পরিবর্তন’ করতে আগ্রহী আমেরিকা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট যখন এই শান্তির বার্তা দেন, তার অব্যবহতি পরেই আবার ইরানকে হুমকিও দেন ট্রাম্প। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন, তেহরানের মদতপুষ্ট হিজ়বুল্লা অশান্তি পাকানো বন্ধ না-করলে মার্কিন বাহিনী ফের হামলা চালাবে ইরানে।
পরে ‘ফক্স নিউজ়’-কে দেওয়া ২০ মিনিটের এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে ফের একপ্রস্থ হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। জানান, ইরান কোনও সমঝোতায় না এলে আমেরিকা হরমুজ় প্রণালী ‘দখল’ করে নিতে পারে। ট্রাম্প বলেন, “প্রয়োজনে আমরা প্রণালী দখল করে নিতে পারি। ওরা যদি কোনও বোঝাপড়ায় না আসে, আমরা টোল আদায় করব।” সুইজ়ারল্যান্ডে যে ইরানি প্রতিনিধিরা ভান্সের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তাঁদেরও হুমকি দেন তিনি। ইরানি প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, “আপনারা এটা (হরমুজ়) বন্ধ করে দিলে আপনাদের দেশ বলে আর কিছু থাকবে না। আপনারা নিজেদের দেশেও ফিরতে পারবেন না।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরেই ইরানের প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য তথা সে দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাঘেই গালিবাফ পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন আমেরিকাকে। জানান, প্রয়োজনে জবাব দিতে প্রস্তুত তেহরানও। ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, “ওদের হুমকির যদি এতই দম থাকচ, তা হলে আজ ওদের এই পর্যায়ে পৌঁছোতে হত না— এটা কি ওঁরা একবারও ভাবেন না? আমরা আমেরিকার হুমকিকে ভয় পাই না।” আমেরিকাকে নিজেদের মন্তব্যের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা উচিত বলেও জানিয়ে দেন তিনি।
উল্লেখ্য, রবিবারের আলোচনায় ইরানের তেলের উপর নিষেধাজ্ঞার উপর ছাড় দেওয়ার বিষয়ে একটি খড়সা নথি তৈরি হয়েছে। ইরানের আটকে থাকা তহবিল খুলে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়নি। বরং, অনেক বেশি আলোচনা হয়েছে লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে। ইরানের প্রতিনিধিদলের দাবি, লেবাননে যুদ্ধ না থামলে তারা অন্য কোনও বিষয়ে আলোচনা করবে না।
আমেরিকা-ইরান চূড়ান্ত সমঝোতার পথে অন্যতম কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন সমস্যা। লেবাননে দীর্ঘ দিন ধরেই সক্রিয় ইরানের মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা। তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে আমেরিকার ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ইজ়রায়েলের। আমেরিকা-ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মউয়ে বলা হয়েছে, লেবানন-সহ সর্বত্র সংঘর্ষ থামবে। কিন্তু লেবাননে উত্তেজনা এখনও থামেনি। এ অবস্থায় রবিবাব সুইৎজ়ারল্যান্ড বৈঠক শুরুর আগেই ইরান জানিয়ে দিয়েছে, বোঝাপড়া চূড়ান্ত করে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা শুরু করার আগে লেবাননে শান্তি ফেরাতে হবে। তাদের বক্তব্য, লেবাননে ইজ়রায়েলি হামলা বন্ধ না-হলে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা সম্ভব নয়।
লেবাননে হামলার বিরোধিতায় শনিবারই ইরান ঘোষণা করে দেয়, তারা ফের হরমুজ় বন্ধ করে দিচ্ছে। যদিও আমেরিকার দাবি, তাদের কাছে হরমুজ় বন্ধ হওয়ার কোনও খবর নেই। এ সবের মধ্যেই ইরানি সূত্রে রয়টার্স জানায়, লেবাননে সংঘর্ষবিরতি বাস্তবায়িত না-হলে হরমুজ় খোলা হবে না। এ অবস্থায় সুইৎজ়ারল্যান্ড বৈঠক চলাকালীনই ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন ট্রাম্প। অনুমান করা হচ্ছে, অশান্তি পাকানোর ‘দায়’ হিজ়বুল্লার উপর চাপিয়ে ইরানকে পাল্টা চাপে রাখতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
লেবাননের অস্থিরতার মাঝে ইজ়রায়েল বা হিজ়বুল্লা কেউ-ই পিছু হটতে চাইছে না। রবিবার বিকেলেই ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজ়রায়েল কাট্জ় জানিয়েছেন, লেবাননে কোনও প্রকার ঝুঁকির মুখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে বাহিনীর উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। ইজ়রায়েলি বাহিনী এখনও লেবাননে রয়েছে, তা-ও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এর পর পরই হিজ়বুল্লা প্রধান নঈম কাসেমেরও বিবৃতি প্রকাশ্যে আসে। তিনিও জানিয়ে দেন, লেবাননে ইজ়রায়েলি বাহিনী থাকতে পারবে না। এর অন্যথা হল উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।