মার্কিন সেনার সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর ক্ষমতা কেবলমাত্র নৈতিকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্য দেশে সেনা অভিযানের পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে কোনও আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করবেন না তিনি। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৃহস্পতিবার স্পষ্ট ভাষায় এ কথা জানিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কমান্ডো বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ পাঠিয়ে ভেনেজ়ুয়ালার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা (যে অভিযানের পোশাকি নাম, ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজ়ল্ভ) নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের। এমনকি, মার্কিন কংগ্রেসও প্রেসিডেন্ট (এবং পদাধিকার বলে মার্কিন সেনার সর্বাধিনায়ক) ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অনুমোদন ছাড়া পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ বন্ধ করতে’ বার্তা দিয়েছে। এই আবহে সাক্ষাৎকারে ক্ষমতার কোনও সীমা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “হ্যাঁ, একটি জিনিস আছে। আমার নিজস্ব নীতি। আমার নিজস্ব মন। এটিই একমাত্র জিনিস যা আমাকে থামাতে পারে। আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই।’’ তবে সেই সঙ্গেই তাঁর আশ্বাস— ‘‘আমরা কোনও সাধারণ মানুষকে আঘাত করতে চাইছি না।’’
সামরিক অভিযান শুরুর আগে থেকেই ধারাবাহিক ভাবে ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে আমেরিকায় মাদক চোরাচালান করার অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবিকে কার্যত খারিজ করে দিচ্ছে আমেরিকার সরকারি রিপোর্ট। আমেরিকায় মাদক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত (ইউএস ন্যাশনাল সার্ভে অন ড্রাগ ইউজ় অ্যান্ড হেল্থ) সমীক্ষার ২০২৪ সালের রিপোর্ট বলছে, মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া থেকেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মাদক ঢোকে মার্কিন মুলুকে। কী ভাবে ঢোকে, তা-ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। এই পরিস্থিতিতে সেনা অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট অপহরণ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। নিউ ইউর্ক টাইমসের প্রশ্নকর্তা ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দায়বদ্ধতা তাঁর সরকারের আছে কি না। জবাবে তাঁর মন্তব্য, ‘‘আপনার আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা কী তার উপর এটি নির্ভর করে?’’
সর্বাধিনায়ক হিসেবে বিশ্ব জুড়ে আমেরিকার আধিপত্যকে সুসংহত করার জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার মতো যে কোনও অস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু সেই সঙ্গেই স্বীকার করে নিয়েছেন ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঘটনাচক্রে, অন্য দেশে সেনা অভিযানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতায় রাশ টানতে বৃহস্পতিবারই যুদ্ধক্ষমতা–সংক্রান্ত প্রস্তাব (ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন) পাশ হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটে। প্রস্তাবের পক্ষে ৫২ এবং বিপক্ষে ৪৭ জন সেনেটর ভোট দিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েক জন সেনেটর বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একজোট হয়ে ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যা নিয়ে ট্রাম্প চাপে পড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করে সে দেশের ‘দখল’ নেওয়ার পরে মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং কিউবাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। ভেনেজ়ুয়েলার মতো পরিস্থিতি হতে পারে বলে তিন দেশকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোর সঙ্গে টেলিফোনে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়েছে। পেট্রো প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছেন, ট্রাম্প তাঁকে খুনের চক্রান্ত করছেন! বস্তুত, ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে প্রথম আনুষ্ঠানিক সামরিক অভিযান হয়েছে ইরানে। গত জুন মাসে সে দেশের তিনটি পরমাণুকেন্দ্র লক্ষ্য করে বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা ফেলেছিল আমেরিকার বি-২ বোমারু বিমান। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘‘সেই বি-২ বোমার বিমানের একটি মডেল আমি আমার ডেস্কে রেখে দিয়েছি।’’
দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অবশ্য সরাসরি মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কিউবায় আক্রমণের কথা বলেননি ট্রাম্প। বরং তাঁর নিশানায় ছিল ইউরোপের দেশ ডেনমার্ক নিয়ন্ত্রিত গ্রিনল্যান্ড। ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘‘গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ হতেই হবে। মালিকানার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’’ কিন্তু গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন আছে কি? ট্রাম্পের জবাব, ‘‘আমি মনে করি সাফল্যের জন্য মানসিক ভাবে এটিই প্রয়োজন। আমি মনে করি, মালিকানা আপনাকে এমন কিছু দেয়, যা অন্য কিছু দিতে পারে না। জানি না, আপনি ইজারা বা চুক্তির কথা বলছেন কি না। আসলে মালিকানা আপনি কেবল একটি নথি স্বাক্ষর করে পেতে পারেন না।’’ গ্রিনল্যান্ড দখল না কি ইউরোপের দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত সামরিক জোট নেটোকে অক্ষত রাখা, তাঁর কাছে কোনটি অগ্রাধিকার তা জানতে চাওয়া হলে অবশ্য সরাসরি কোনও উত্তর দেননি তিনি। তবে সেই সঙ্গেই তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা পাশে না থাকলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চাপ বাড়াবেন পশ্চিম ইউরোপের উপর।