৯২ বছর বয়স। এই বয়সেও বিচারকের আসনে তিনি। মামলা শোনেন। তবে কোনও আতিপাতি মামলা নয়, বেশ ওজনদার মামলাই তাঁর এজলাসে বিচারাধীন। তবে সর্বশেষ তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে ভেনেজ়ুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মামলা! তিনি হলেন নিউ ইয়র্কের জেলা আদালতের বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন।
৯২ বছর বয়সে বিচারক হেলারস্টাইন যে মামলা শুনছেন, পর্যালোচনা করে রায় দিচ্ছেন, তাতেই বিস্মিত অনেকে। বিচারক হেলারস্টাইন মার্কিন বিচারব্যবস্থায় খুব পরিচিত নাম। ফেডারেল বেঞ্চে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনেছেন, রায় দিয়েছেন। সেই তালিকা খুব একটা ছোট নয়।
বিচারকদের বয়স নিয়ে আমেরিকার বিচারব্যবস্থায় কী নিয়ম রয়েছে? মার্কিন সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ফেডারেল বিচারক বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আজীবন বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন! বিচারকদের অবসরগ্রহণের কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই। তেমন নেই নিয়োগের ক্ষেত্রেও। যোগ্যতা থাকলেই যে কোনও বয়সে বিচারক হওয়া যায় আমেরিকায়।
আমেরিকার সংবিধান বলছে, বিচারকদের অবসরগ্রহণের কোনও বাধ্যতামূলক বয়সসীমা নেই। বিচারক যত দিন ইচ্ছা বা সক্ষম, তত দিন দায়িত্ব সামলাতে পারেন। আমেরিকায় বিচারকদের মধ্যে অনেকেরই কর্মজীবন ৩০-৪০ বছর দীর্ঘ হয়! সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, এক জন ফেডারেল বিচারকের গড় বয়স প্রায় ৬৯ বছর।
আমেরিকান সংবিধানে বিচারকদের জন্য আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। অবসর না-নিয়েও বিচারকেরা গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল মামলা থেকে অব্যহতি চাইতে পারেন। তবে এতে তাঁদের বেতনের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না। ৬৫ বছর বয়সের পর ‘সিনিয়র স্টেটাস’ নিয়ে চাকরিতে বহাল থাকতে পারেন বিচারকেরা। তবে তার জন্য তাঁর কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁদের ছেড়ে যাওয়া জায়গায় নতুন নিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। তবে হেলারস্টাইনের মতো অনেক বিচারক কর্মজীবনে সক্রিয় থাকতেই পছন্দ করেন।
আরও পড়ুন:
১৯৩৩ সালে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী হেলারস্টাইন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি যে আদালতের বিচারক, সেই আদালতেই কেরানি হিসাবে কর্মজীবন শুরু তাঁর। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রসিকিউশন সার্ভিসে কাজ করেছেন তিনি। তার পরে আইনজীবী হিসাবে প্র্যাকটিস শুরু করেন হেলারস্টাইন।
১৯৯৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁকে মনোনীত করে বিচারক করেছিলেন। সরকারবিরোধী অনেক রায় তাঁর কলমে লেখা হয়েছে। আমেরিকার বিচার মহলে তিনি যুক্তিবাদী, স্পষ্ট বক্তা হিসাবে পরিচিত। তাঁর দেওয়া অনেক রায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে একটা মামলা এমনও রয়েছে যেখানে সরাসরি জড়িত ট্রাম্প স্বয়ং। পর্নতারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর মুখ বন্ধ রাখতে ট্রাম্প ১ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার ঘুষ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, টাকা দেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে ট্রাম্প তাঁর ব্যবসায়িক সংস্থার নথিপত্রে জালিয়াতি করেছিলেন। তথ্য গোপনের উদ্দেশ্যে ব্যবসায়িক নথিপত্রে জালিয়াতি করার দায়ে মামলা হয়। সেই মামলা শুনেছিলেন বিচারক হেলারস্টাইন। রায় গিয়েছিল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনও সেই মামলা নিয়ে লড়াই করছেন আদালতে।
মার্কিন আইনজীবী মহলে বিচারক হেলারস্টাইন খুবই পরিচিত। অনেকেই বলেন, ‘‘আদালতের সাধারণ রীতিনীতি অনেক সময় ভেঙেছেন বিচারক হেলারস্টাইন। সরাসরি আইনজীবীদের ফোন করে মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। এক জন প্রাক্তন প্রসিকিউটরের কথায়, ‘‘আমি যখন জুনিয়র প্রসিকিউটর ছিলাম তখন এক বার বিচারক হেলারস্টাইনের ফোন পেয়েছিলাম। তিনি কোনও এক মামলা নিয়ে আমার থেকে জানতে চেয়েছিলেন।’’ বিচারক হিসাবে হেলারস্টাইন খুবই আধুনিক ভাবাপন্ন। কোনও আইনজীবী যদি মামলা ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, তবে তাঁকে ভর্ৎসনা করেন তিনি। আইনজীবীদের মতে, দ্রুত বিচারই পছন্দ করেন বিচারক হেলারস্টাইন।
আমেরিকার মতো অন্য কোনও দেশের বিচারব্যবস্থায় এত বয়স্ক বিচারক রয়েছেন? ভারতের ক্ষেত্রে কী নিয়ম? এ দেশের আইনজীবী শুভ্রপ্রকাশ লাহিড়ি বলেন, ‘‘আমাদের দেশে এমন কোনও নিয়ম নেই। আইনেই কিছু বলা নেই। আইন অনুযায়ী হাই কোর্টের বিচারপতিকে ৬২ বছর এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে ৬৫ বছর বয়সে অবসর নিতে হয়। নতুন করে আর মেয়াদ বৃদ্ধির কোনও নিয়ম নেই।’’