ভোট বড় বালাই যেমন ভারতে, তেমনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রেও। অতীতে বারবার দেখা গিয়েছে নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ভারতে, বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বকে সংখ্যালঘু সম্প্রীতির বার্তা দিতে। বাংলাদেশে নির্বাচনের নামমাত্র আগে, আজ জামায়েতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বার্তা দিলেন ভারত থেকে আসা সাংবাদিকদের কাছে। শুধু তাই নয়, জানালেন ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটিতেই তিনি বিশ্বাসী নন, তিনি এবং তাঁর দল ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্বে’ বিশ্বাসই করেন না। ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলাই’ তাঁর লক্ষ্য। এ বারে মহিলা প্রার্থী দেওয়া সম্ভব না হলেও পরবর্তী নির্বাচনে অবশ্যই মহিলা প্রার্থী থাকার আশ্বাস দিয়ে আমীরের বক্তব্য, ‘‘কী ভাবে আমি নারীবিদ্বেষী হব? আমার স্ত্রী এবং দুই কন্যা রয়েছে।’’
যে অশান্তি এবং সংঘাতে গত দেড় বছর ধরে ভুগতে হয়েছে ঢাকাকে, আগামিকাল ভোটের সময়ে বা তার পরে ফের সেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে নিঃসন্দেহ নয় এই দেশ। বিশেষত লুট হওয়া অনেক অস্ত্র যখন এখনও উদ্ধার হয়নি। তবে এটা স্পষ্ট, বিএনপি-কে এক বিন্দু জমিও ছাড়তে নারাজ জামাত। তাদের দুর্বল ভোটভিত্তি সত্ত্বেও যে ভাবে হাওয়া তোলা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে সমাজমাধ্যমে এবং রাজনৈতিক ভাষ্যে, তাতে ভোটপণ্ডিতেরাওযথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘সমাজমাধ্যমে বাংলাদেশের মোট যে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট রয়েছে তার প্রায় অর্ধেকটাই জামাতের। তারা সমাজমাধ্যমে সরব, আবার ‘মব’-কে পরোক্ষ ভাবে রাস্তায় উত্তেজিত করতেও সক্ষম। সমাজমাধ্যমের পরিসরে বিএনপি-র তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে থেকেছে জামাত। এ ছাড়া, গত দেড় বছরে তারা যে ভাবে অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের আশীর্বাদ পেয়েছে, তা বিএনপি পায়নি। এনসিপি-র উপদেষ্টা ছিলেন সরকারে। এনসিপি যে এখন জামাতেরই শাখা সংগঠন তা বুঝতে বোধহয় কারও বাকি নেই।’’
বিএনপি সূত্রের দাবি, পুলিশ এবং প্রশাসনে এই মুহূর্তে ৭০ শতাংশ লোক জামাতের সমর্থক। তারা নিঃশব্দে অন্য দলে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশের পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদ দখল করেছে জামাত, কারণ ছাত্র লীগের (আওয়ামী লীগের ছাত্র শাখা) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জামাতের সদস্যেরা মিশে ছিল, কেউ টেরও পায়নি। এখন তারা বিএনপি-র মধ্যেও মিশে রয়েছে কি না তা-ওখতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করছে দলেরই একাংশ।
রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, জামাত মুখে যা-ই বলুক এখনও পর্যন্ত তাদের সংগঠনের সর্বোচ্চ স্তরে কোনও মহিলা প্রতিনিধিত্ব নেই। ভবিষ্যতে থাকবে এমনটাও মনে করা যাচ্ছে না। মুখে বললেও, অথবা নিজেদের ইস্তাহারে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের দিশা দিলেও ভারত-বিরোধী যে বয়ান বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, তাকে পরোক্ষে সমর্থনই করেছে জামাত, এই অভিযোগও করেছে বিএনপি।
আপাতত আগামিকালের ভোটে অন্যতম নির্ধারক বিষয় হতে চলেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোথায় যাবে তার হিসাব। জানা যাচ্ছে, ঢাকা শহরে অনেক আওয়ামী সমর্থকই বুথ পর্যন্ত যাবেন না। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে চিত্র ভিন্ন। ভারতে গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো বাংলাদেশে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ। ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে এক একটি পরিষদ গঠিত হয় যেখানে থাকেন গড়ে ১৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। জামাত বা বিএনপি যে যেখানে শক্তিশালী, তারা সেখানে ওই পরিষদের প্রধানকে চাপ দিচ্ছে বুথে যত বেশি সম্ভব ভোটার পাঠাতে। না পাঠালে ভবিষ্যতে মিথ্যা মামলা দেওয়ার ভয় রয়েছে বলে ঘরোয়া ভাবে জানাচ্ছেন সন্ত্রস্ত এই প্রধানরা। গত দেড় বছরে ইউনিয়ন স্তরের নির্বাচন হয়নি (ইউনূস সরকার চেয়েছিল কিন্তু বিএনপি তা আটকেছে)। ফলে ইউনিয়ন প্রধানেরা সবাই আওয়ামী লীগেরসময়েই নির্বাচিত।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনায় প্রমাণিত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ককেও পাখির চোখ করেছে জামাত এবং বিএনপি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)