Advertisement
E-Paper

বাংলাদেশের সিনেমার ষাট বছর

সুস্থধারার ছবির জন্য ওই দেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় একটি দশক। লিখছেন সুশীল সাহাসুস্থধারার ছবির জন্য ওই দেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় একটি দশক। লিখছেন সুশীল সাহা

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০০

পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ, যে নামেই অভিহিত করি না কেন, ওই ভূখণ্ডে সিনেমার জয়যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ ছায়াছবি দিয়ে। সময়টা তেমন অনুকূল ছিল না। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল অনেকটা প্রভু-ভৃত্যের। পশ্চিমা অবাঙালি প্রভুরা সব সময় এক ধরনের বিমাতৃসুলভ আচরণ করতে শুরু করেছিল স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকেই। তাই অনিবার্য ভাবে দুই প্রদেশের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দিয়ে যার সূচনা, তার পরিণতি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। মাঝখানের ২৩টা বছর ক্রমাগত অপমানের, অসম্মানের, শোষণ, বঞ্চনা আর উদ্দাম প্রতিবাদের।


তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘চিত্রা নদীর পারে’ ছবির একটি দৃশ্য

১৯৫৩ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ডিরেক্টর আব্দুস সাদেক স্থানীয় সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে দেশীয় সিনেমা হলগুলিতে বিদেশি ছবির বদলে স্থানীয় ছবি দেখানোর অভিপ্সায় ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনার কথা উত্থাপন করেন।এই প্রস্তাবে স্থানীয় মানুষজন উৎসাহিত হলেও অবাঙালি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ফজলে দোসানি বলেন, ঢাকার আর্দ্র আবহাওয়ায় নাকি আদৌ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। তখনকার দিনে পূর্ব বাংলার ৯২টি সিনেমা হলে দেখানো হত ভারতীয় এবং হলিউডের ছবি। যাই হোক, ফজলে দোসানির মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে ওই সভায় নাট্যকর্মী আবদুল জব্বার খান চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আগামী দু’তিন বছরের মধ্যে তিনি ছবি তৈরি করে ওই বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে দেবেন। বস্তুত, ১৯৫৪ সালে শুটিং শুরু করে ১৯৫৬-তে মুখ ও মুখোশ-এর নির্মাণ কাজ শেষ করে ছবিটির শুভমুক্তি ঘটান। তারপর থেকে শুরু হল ওই বাংলার ছবি নির্মাণের জয়যাত্রা। গোটা ষাটের দশক জুড়ে অসংখ্য ছবি তৈরি হল, যার মধ্যে কয়েকটি শিল্পসম্মত ছবি হল এ জে কারদারের জাগো হুয়া সভেরা’, সাদেক খানের ‘নদী ও নারী’, জহির রায়হানের ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’, সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’, বেবী ইসলামের ‘তানহা’, সুরুর বারবাঙ্কাভির ‘আখরি স্টেশান’ ইত্যাদি। পাশাপাশি, অসংখ্য বাণিজ্যিক ছবি তৈরি হয়েছিল ওই সময়ে। তখন ওখানকার সিনেমা হলগুলোতে রমরমিয়ে চলত স্থানীয় ছবি। তার মধ্যে পূর্ব ভূখণ্ডে নির্মিত উর্দু ছবিও ছিল।


‘মাটির ময়না’ ছবির একটি দৃশ্য

’৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর জন্ম হল স্বাধীন বাংলাদেশের। শুরু হল নতুন দেশের নতুন অভিযাত্রা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠনের লক্ষ্মণরেখা পার হয়ে শুরু হল শিল্পসাহিত্যের অগ্রগতি। চোখে পড়ার মতো কাজ তত দিনে দেখা দিয়েছে। নাটক, গান, আবৃত্তি, নাচ এবং সর্বোপরি সাহিত্যের নানা রকম বিস্ময়কর অগ্রগতি আমরা দেখলাম। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সিনেমা শিল্প যেন যাত্রা শুরু করলো একেবারে উল্টো দিকে। অসীম সম্ভাবনাময় জহির রায়হানকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীনতার প্রাক্কালেই। শুধুমাত্র আলমগীর কবির স্রোতের বিরুদ্ধে একটার পর একটা ভাল ছবি তৈরি করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনিও এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। গোটা সাতের দশক জুড়ে বাংলাদেশে নির্মিত হল অসংখ্য বস্তাপচা বাণিজ্যিক ছবি, যাকে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আশির দশকের এক জন চলচ্চিত্রকার বলেছিলেন,’গর্ভস্রাব’। সত্যি সত্যিই, মূলধারার সেই সব ছবিকে বীভৎস বললেও কম বলা হয়। সেই ধারার প্রতিকল্পে বাংলাদেশে ওই আশির দশকেই শুরু হয় বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ, যার পথিকৃত হলেন তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ। সুস্থধারার ছবির জন্য ওই দেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় একটি দশক। আসলে শিল্পসাহিত্যের অগ্রগতি আপনা আপনি হয় না। এ জন্য চাই লড়াইয়ের মানসিকতা। সৃজনশীল মানুষজন যেমন চিরকাল প্রচলিত পথের বাইরে অন্য পথের দিশা দেখান, তেমন করেই এক দিন বাংলাদেশে শুরু হল নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা।

পরিচালক প্রয়াত তারেক মাসুদ এবং তানভীর মোকাম্মেল

আশির দশকে তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ এবং মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’ সমগ্র বাংলাদেশে একসঙ্গে প্রদর্শিত হয়ে খুলে দিল সম্ভাবনার এক নতুন দরজা। এই প্রদর্শন হত কিন্তু একেবারেই অন্যরকম ভাবে। কোনও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশঘরে, কিংবা কোনও পাবলিক লাইব্রেরিতে বা অন্য কোনও সভাঘরে। আয়োজক স্থানীয় মানুষজন, তার মধ্যে উৎসাহী ছাত্র যুবাবৃন্দই প্রধান। এক মহা ধুন্ধুমার ব্যাপার। গোটা বাংলাদেশে তখন স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকল। তার মধ্যেই হয়ে চলল এমন এক আন্দোলনমুখর কর্মকাণ্ড। অবিশ্বাস্য এই বিকল্প ধারার ছবি প্রদর্শন, হয়তো কালের নিয়মে অনিবার্য এই পরিণতি। রবীন্দ্রনাথের ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’— এই অমোঘ বাক্যের অসামান্য উদাহরণ বাংলাদেশের ‘প্যারালাল ফিল্ম মুভমেন্ট’। এই তিনটি শব্দের অনুবাদ না করে কাজটির গুরুত্ব বোঝাবার জন্য ইংরেজিতেই রাখলাম।

(সুশীল সাহা বাংলাদেশ-চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ)

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy