পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাগরিকদের পেট্রল, ডিজ়েলের খরচ কমানো বা বিদেশযাত্রা বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে ডলার সাশ্রয় করে টাকার পতন রোখা যাবে না টের পেয়ে মোদী সরকার এ বার কার্যকরী পদক্ষেপ করল। নতুন বিদেশি লগ্নি না আসা এবং শেয়ার বাজার থেকে তা বেরিয়ে যাওয়াটাই যে বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে টান পড়া এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণ, তা মেনে নিয়ে শেয়ার বাজারে বিদেশি লগ্নিকারীদের করে সুরাহা দিতে চাইল। সরকারি সূত্রের খবর, শেয়ারে বিদেশি লগ্নির উপর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভে কর পুরোপুরি তোলার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। এ জন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলেই আয়কর আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। সেই সঙ্গে সরকার ছ’টি শিল্প ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদন বাড়িয়ে, আমদানি কমানোর রাস্তা খুঁজতে ছ’টি কমিটি তৈরির সিদ্ধান্তও নিয়েছে।
এখন শেয়ারে বিদেশি লগ্নিকারীদের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভে ১২.৫% কর বসে। সরকারি ঋণপত্র থেকে সুদ বাবদ আয়ে তা ২০%। অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর, অধ্যাদেশ জারি করে বিদেশি লগ্নিকে এর থেকে ছাড় দেওয়া হবে। কংগ্রেসের কটাক্ষ, এর থেকেই স্পষ্ট কেন্দ্র কতখানি আতঙ্কিত। তৃণমূলের অভিযোগ, দেশের করদাতারা বোঝা বইবেন। দেশের লগ্নিকারীরা মূলধনী আয়ে কর মেটাবেন। কিন্তু বিদেশি লগ্নিকারীরা কর ছাড় পাবেন। কংগ্রেসের দাবি, ‘‘আসল সমস্যা হল, বেসরকারি সংস্থা লগ্নি করছে না। এ দেশের শিল্পপতিরা বিদেশে পুঁজি ঢালছেন।’’ অর্থ মন্ত্রকের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আজ এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মন্ত্রকের ব্যাখ্যা, ২০২৬-এর মার্চে দেশে যত বিদেশি লগ্নি এসেছে, তার থেকে ১১৭০ কোটি ডলার বেশি বেরিয়ে গিয়েছে। এর প্রধান কারণ, বিদেশি প্রত্যক্ষ লগ্নির ক্ষেত্রে বেরিয়ে যাওয়া লগ্নির থেকে দেশে আসার পরিমাণ ১৬০ কোটি ডলার বেশি হলেও, শেয়ার বাজারে যা এসেছে তার থেকে ১৩৩০ কোটি ডলার বেশি বিদেশি লগ্নি বেরিয়ে গিয়েছে। ফলে চাপে বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার। তার প্রভাব পড়েছে টাকার দামে। ২০২৬-এ এখনও পর্যন্ত ২.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার বিদেশি লগ্নি হারিয়েছে বাজার। যার জেরে ভারতীয় মুদ্রাকে তলানিতে ঠেলে ডলার উঠেছিল ৯৬.৯৬ টাকায়।
ডলার বাঁচাতে কেন্দ্রের শিল্পোৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য যে সব ক্ষেত্রে— ওষুধ, জৈবপ্রযুক্তি ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক ও পেট্ররসায়ন, বস্ত্র ও জুতো, মূলধনী পণ্য, বৈদ্যুতিক-সহ সব গাড়ি, বিদ্যুৎ, নির্মাণ যন্ত্রাংশ ও পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা, এরোস্পেস ও বৈদ্যুতিন পণ্য। শিল্পোন্নয়ন ও বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে প্রতিটির জন্য থাকবে কমিটি। অর্থনীতি নিয়ে বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রকের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে কথা হয়েছে। সেখানে আর্থিক বিষয়ক সচিব ও মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। পরে স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান, বিজেপি সাংসদ ভর্ত্রুহরি মহতাব বলেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা হয়েছে। চ্যালেঞ্জ হল, সরকারি লগ্নি বাড়লেও বেসরকারি বাড়ছে না। টাকার দরের পতনও চিন্তার। ফের বৈঠক করব। কিছু সুপারিশ করব কেন্দ্রের কাছে।’’
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, ‘‘দেশে আর্থিক সুনামি আসছে। তার মোকাবিলায় নরেন্দ্র মোদীকে জরুরি অবস্থার মতো নিয়ন্ত্রণ জারি করতে হতে পারে। তবে সে সব করেও তিনি এক বছরের মধ্যে ক্ষমতা হারাবেন।’’ আজ কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, ‘‘কেন্দ্র আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তাই বিদেশি লগ্নি থেকে মূলধনী লাভ কর তুলে দিতে চাইছে। যা সবেমাত্র ২০২৪-এর জুলাইতে ঠিক হয়েছিল।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)