E-Paper

গরমকে মানিয়েই সচল শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ

ধর্মতলা বাস ডিপোয় বহরমপুরগামী বাসের অপেক্ষায় ছিলেন সুমনা মণ্ডল। মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে নিখরচায় ভ্রমণের সুবিধা থাকলেও দীর্ঘ পথের যাত্রায় তাঁর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ গরম।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ০৭:৩৭
বিভ্রম: প্রবল গরমে শহরের রাজপথে মরীচিকা। বৃহস্পতিবার, ময়দান এলাকায়।

বিভ্রম: প্রবল গরমে শহরের রাজপথে মরীচিকা। বৃহস্পতিবার, ময়দান এলাকায়। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

কলকাতার গরম নতুন নয়। কিন্তু এ বারের গরম যেন প্রতিদিন নতুন করে শহরের পরীক্ষা নিচ্ছে। সকাল ন’টার আগেই রাস্তাঘাট গরমে ঝাঁঝালো, দুপুর গড়ালে পরিস্থিতি আরও অসহনীয়। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এতটাই বেশি যে, ছায়াতেও স্বস্তি মিলছে না। তবু থেমে নেই শহর। গরমকে হারানো সম্ভব নয়, তাই পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েই স্বাভাবিক জীবন যাপনের চেষ্টা করছেন মানুষ।

ধর্মতলা বাস ডিপোয় বহরমপুরগামী বাসের অপেক্ষায় ছিলেন সুমনা মণ্ডল। মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে নিখরচায় ভ্রমণের সুবিধা থাকলেও দীর্ঘ পথের যাত্রায় তাঁর কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ গরম। সংক্ষেপে বললেন, “ভাড়া বাঁচছে, কিন্তু গরমটা খুব কষ্ট দিচ্ছে।” কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের এক ছাত্রের কথাতেও ফুটে উঠল একই ছবি— “ক্লাসে এসি নেই। গরমের ছুটিও নেই। ক্লাসে তো আসতেই হবে।”

প্রায় সব ব্যস্ত এলাকাতেই বোতলবন্দি জল ও ঠান্ডা পানীয়ের চাহিদা বেড়েছে। জল বিক্রেতা রমেশ চৌধুরী বললেন, “দুপুরে জলের বিক্রি অনেক বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ খাবার না খান, জল খাচ্ছেন।” গরমের অভিঘাত সব চেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন, যাঁরা দিনের বড় অংশটা খোলা আকাশের নীচে কাটান। সেই তালিকায় অন্যতম ট্র্যাফিক পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশের তরফে অতিরিক্ত বেল্ট বা ইউনিফর্মের কিছু আনুষঙ্গিক জিনিস ব্যবহার না করার নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ট্র্যাফিক গার্ডে কর্মরত পুলিশকর্মীদের নিয়মিত জল এবং ওআরএস সরবরাহ করা হচ্ছে।

শ্যামবাজার মোড়ে কর্তব্যরত এক ট্র্যাফিক আধিকারিক বললেন, “কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কাজ তো করতেই হবে।” পার্ক সার্কাস মোড়ের এক ট্র্যাফিক আধিকারিকের বক্তব্য, “গরমটা এ বার একটু বেশিই অনুভব হচ্ছে। রাস্তার উত্তাপটা সয়ে নিয়েই কাজ করছি।”

দুপুরের রোদে বাইক নিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে অ্যাপ-নির্ভর খাবার সরবরাহকারী সংস্থার কর্মীদের। তেমনই এক জন শেখ নইমুদ্দিন বললেন, “কোনও কোনও বাড়িতে একটু বসতে বলছেন, জল খেতে দিচ্ছেন।”

গরমের প্রভাব পড়েছে স্কুলের রুটিনেও। শিক্ষা দফতর আগেই আগামী দু’সপ্তাহ অধিকাংশ সরকারি স্কুল সকালে চলবে বলে ঘোষণা করেছিল। সেই অনুযায়ী কোথাও সকাল সাড়ে ছ’টা, কোথাও সাতটায় ক্লাস শুরু হচ্ছে। তবে যে সব স্কুলে একই ভবনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিভাগ চলে, সেগুলির পক্ষে সময় বদলানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক স্কুলে জলের বোতল ও ছাতা আনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেশ কিছু স্কুলে ক্লাসের মাঝেই জল খাওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হচ্ছে।

খেলাধুলোর জগতেও একই ছবি। দক্ষিণ কলকাতার একটি ক্রিকেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জানাচ্ছে, ১৩ বছরের নীচের পড়ুয়াদের প্রশিক্ষণ একেবারে ভোরে সরিয়ে আনা হয়েছে। বড়দের ক্ষেত্রেও সময়সূচিতে পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুশীলনের মাঝখানে বাড়তি জলপানের বিরতি রাখা হয়েছে।

চিকিৎসক সূরোত্তম পোদ্দারের পরামর্শ, “সাধারণ দিনের তুলনায় অন্তত এক লিটার বেশি জল খাওয়া উচিত। বেলা ১২টা থেকে ৩টের মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভাল।” বেরোলে ছাতা ও জলের বোতল সঙ্গে রাখা এবং হালকা সুতির পোশাক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

স্বস্তির বৃষ্টি এখনও নিয়মিত নয়। কিন্তু শহর তার অপেক্ষা করে বসে নেই। কেউ সময় বদলাচ্ছেন, কেউ অভ্যাস। এ শহর বুঝে গিয়েছে, এই লড়াইয়ে জয় মানে গরমকে হারানো নয়, তার মধ্যেই জীবনকে সচল রাখা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Summer Season Heat

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy