E-Paper

‘গরিবের পেটে লাথি মারব’! স্টিয়ারিংয়ে বসে হাত কাঁপছে বুলডোজ়ার চালকের

সরকার পরিবর্তনের পরে হকার উচ্ছেদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বৃহস্পতিবার গলা কেঁপে গেল এক বুলডোজ়ার চালকের। তাঁর মনে হয়েছে, ‘‘আমার এই পেশা অনেকের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে না তো!’’ মুর্শিদাবাদ থেকে ফোনে ওই তরুণ বললেন, ‘‘যে পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, তার ঘোর এখনও কাটেনি।”

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ০৭:২৯
দমদম স্টেশন চত্বরে হকারদের অস্থায়ী দোকান ভাঙছে বুলডোজ়ার।

দমদম স্টেশন চত্বরে হকারদের অস্থায়ী দোকান ভাঙছে বুলডোজ়ার। —ফাইল চিত্র।

স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাত সে দিন কেঁপেছে। পেশাদারি দায়িত্বের সঙ্গে গোল বেধেছে মানবিকতার।

সরকার পরিবর্তনের পরে হকার উচ্ছেদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শোনাতে গিয়ে বৃহস্পতিবার গলা কেঁপে গেল এক বুলডোজ়ার চালকের। তাঁর মনে হয়েছে, ‘‘আমার এই পেশা অনেকের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে না তো!’’ মুর্শিদাবাদ থেকে ফোনে ওই তরুণ বললেন, ‘‘যে পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, তার ঘোর এখনও কাটেনি। সে দিন কোনও মতে কাজ করতেই হয়েছিল। কিন্তু তার পরে আর নয়। স্ত্রীর শরীর খারাপ বলে মালিকের থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে এসেছি। এখন কিছু দিন আর কলকাতায় কাজে যাব না ঠিক করেছি। এ সব শেষ হলে ভাবা যাবে। লোকের পেটে লাথি মারার ফল ভাল হয় না। আমি এই অন্যায় করতে পারব না।’’

বিভিন্ন সময়ে বেআইনি বহুতল থেকে শুরু করে দোকানপাট, অনেক কিছুই ভাঙার দায়িত্ব পড়ে তাঁদের উপরে। সদ্য বিভিন্ন রেল স্টেশন ও বাজার এলাকায় হকার উচ্ছেদের কাজেও যেতে হয়েছে তাঁদের। ভিড়, প্রতিরোধ, কান্না ঠেলেই চালাতে হয়েছে বুলডোজ়ার। কিন্তু এই কাজ কি তাঁদের জন্য সহজ ছিল? মুর্শিদাবাদের ওই কর্মীই জানালেন, দিনকয়েক আগেই কলকাতায় তাঁর বুলডোজ়ারের সামনে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এক প্রৌঢ়া। সামনে জড়ো হওয়া ভিড় সরাতে পুলিশ তখন লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ওই প্রৌঢ়া দু’হাতে সামনের ‘বাকেট’ ধরে বুলডোজ়ারের পথ আটকে দাঁড়ান! একটু এ দিক-ও দিক হলেই বিপদ। বাকেটের লোহা গেঁথে যেতে পারে তাঁর শরীরে। এক উর্দিধারীর নির্দেশে দ্রুত ছুটে আসেন কয়েক জন মহিলা পুলিশকর্মী। শুরু হয় প্রৌঢ়ার হাত ধরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। বুলডোজ়ারের লোহার কাঠামোর টোকায় তত ক্ষণে ভেঙে গিয়েছে প্রৌঢ়ার হাতের শাঁখা-পলা। কাহিল হয়ে পড়া প্রৌঢ়া শেষে হাতজোড় করে বসে পড়েন বুলডোজ়ারের সামনেই। বুলডোজ়ার চালকের মনে হচ্ছিল, সব চেষ্টার শেষে তিনি যেন প্রবল কাকুতিমিনতি করে তাঁকেই পরিত্রাতা হওয়ার অনুরোধ করছেন! এর পরে আর কাজে যাওয়ার সাহস হয়নি ওই তরুণের।

ওই চালকের মতো না বলতে পারার সুযোগ তাঁর নেই, জানালেন বারাসত-মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা দেবব্রত মণ্ডল। বুলডোজ়ার কিনে তিনি এবং তাঁর ভাই চালান। বললেন, ‘‘বাড়িতে দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের স্কুলে পড়ার খরচ থেকে শুরু করে সংসারের সমস্ত দায়িত্বই আমার উপরে। অনেক কষ্টে জেসিবি কোম্পানির ‘ব্যাকহো লোডার’ (বুলডোজ়ার) কিনেছি। ৪২ লক্ষ টাকা দাম। ঋণের টাকা মেটাতেই কালঘাম ছুটছে। পুলিশের ডাকে ভাঙাভাঙির কাজে গেলে দিনে সাত হাজার টাকা পাওয়া যায়। তিলজলায় প্রথম যে দিন বুলডোজ়ার গেল, সে দিন আমার গাড়িটাই গিয়েছিল। কিন্তু দিনের শেষে অত মানুষের চোখের জল আমাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।’’ এর পরে বললেন, ‘‘পুরো না তো বলতে পারব না! ঠিক করেছি, বস্তি বা ঝুপড়ি উচ্ছেদের কাজ করব না। তবে, বড় বাড়ি বা অন্য কোনও বেআইনি নির্মাণ ভাঙার ডাক এলে অবশ্যই যাব।’’

এই মুহূর্তে কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেবব্রতদের মতো ব্যক্তি-মালিকের থেকে বুলডোজ়ার ভাড়ায় নেওয়া হচ্ছে, কোথাও ব্যবহার হচ্ছে কলকাতা পুরসভার নিজস্ব বুলডোজ়ার। পূর্ত দফতরের তরফেও এই ধরনের বুলডোজ়ার ভাড়ায় আনা হচ্ছে। রেল স্টেশনে হকার উচ্ছেদের জন্য বুলডোজ়ার আনাচ্ছে রেল পুলিশ। কলকাতা পুরসভার বুলডোজ়ার চালানোর কাজে যুক্ত রাজু ভৌমিক বললেন, ‘‘এক সময়ে মনে হয়েছে, ফুটপাত বা রেল স্টেশন সরকারের এলাকা। সরকার যবে খুশি ফেরত নিতে পারে। অনেকে সময় দেওয়ার, পুনর্বাসনের কথা বলছেন। কিন্তু হকারদের তো অতীতে কম সময় দেওয়া হয়নি!’’ রাজুর দাবি, ‘‘কিন্তু কাজ করতে গিয়ে মানুষের পেটে লাথি মারছি, তিলে তিলে বানানো তাঁর দোকান নষ্ট করে দিচ্ছি, এটা ভাল লাগছে না। বাড়িতে মেয়ে এবং স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে ওরাও বলছে, গরিবকে দিয়ে গরিবকে মারা হচ্ছে।’’

কয়েক মুহূর্ত থেমে গলা শক্ত করে রাজু এর পরে বললেন, ‘‘কিন্তু আমাদের উপায়ই বা কী? অর্ডার পেলে কাজ তো করতেই হচ্ছে। নিজের পেট বাঁচাতে অন্যের পেটে লাথি মারতেই হচ্ছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bulldozer Hawker Eviction West Bengal Governor BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy