পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে দেশে গ্যাসের জোগান আপাতত ধাক্কা খাবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে মোদী সরকার। সাধারণ মানুষকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে চেয়েছে তারা। তবে দিনের শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোয় আখেরে চাপ বাড়ল আমজনতার পকেটে। আজ রাতে গৃহস্থের হেঁশেলে রান্নার গ্যাসের দাম একলপ্তে সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করল রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। ফলে কলকাতায় আজ থেকেই গ্রাহকদের ১৪.২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে বার করত হবে ৯৩৯ টাকা। হোটেল-রেস্তরাঁয় রান্নার ১৯ কেজির বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে ১১৪.৫০ টাকা। হয়েছে ১৯৯০। ফলে আগামী দিনে দেশে পেট্রল-ডিজ়েলের দামও বাড়তে চলেছে কি না, প্রশ্ন উঠে গিয়েছে আজ।
তেল সংস্থা সূত্রের দাবি, আপাতত গ্যাসের জোগানে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু জ্বালানিতে আমদানি নির্ভর ভারতের এই খাতে খরচ এত বিপুল বেড়েছে যে, দাম না বাড়িয়ে উপায় ছিল না। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, কিছু দিন আগে বিশ্ব বাজারে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি তৈরির উপাদানগুলির দাম কমতে দেখা গিয়েছিল। অথচ সেই সুবিধা দেশের মানুষ পাননি। পেলে, এখন দাম তুলনায় কম হত। একাংশ মনে করাচ্ছে, এর আগে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এক বার গ্যাসের দাম ৫০ টাকা বাড়ানোর পরে তেলমন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী জানিয়েছিলেন, নিয়মিত তেল-গ্যাসের আন্তর্জাতিক দর খতিয়ে দেখে দেশের দাম কমানো বা বাড়ানো হবে। সেই কথাও হাওয়ায় হারিয়ে গিয়েছে। এখনও তেমন কিছু হতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আজ দেশের মানুষের স্বার্থে জোগানের আশ্বাস আসার পরে আচমকাই রাতে দাম বেড়ে যাওয়া বেশ কিছুটা অপ্রত্যাশিত।পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জুড়েই তেল ও গ্যাসের বাজারে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে দেশের বাজারে এখনও অভাব তৈরি হয়নি বলে কেন্দ্রীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ও ডিলাররা জানিয়েছেন। তার পরেও গুজব ছড়ানো হচ্ছে দেখে শুক্রবার ফের তেল ও গ্যাস মন্ত্রক জানায়, রান্নার গ্যাস বা এলপিজি নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তবে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আজ কেন্দ্র জরুরি পণ্য আইনে সরকারি, বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলিকে এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছে। বার্তা, দেশে ৩৩.৩ কোটি মতো রান্নার গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। গৃহস্থদের রান্নার গ্যাসের জোগান নিশ্চিত রাখা মোদী সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ় প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ভারতেরই অন্তত ৩৭টি জাহাজ আটকে গিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারতে ৩.৩১ কোটি টন এলপিজি ব্যবহার হয়েছিল। এর দুই-তৃতীয়াংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি করা গ্যাসের ৮৫%-৯০% আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে, হরমুজ় প্রণালী হয়ে। ভারতের সমস্যা হল, তেলের জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়া রয়েছে। গ্যাসের নেই। ফলে দীর্ঘদিন জোগান বন্ধ থাকলে রান্নার গ্যাসের সরবরাহ, দামে প্রভাব পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বেআইনি মজুত, কালোবাজারি রুখতে আজ তেল মন্ত্রকের শীর্ষ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ভারত এখনও স্বস্তিতে রয়েছে। হরমুজে যে গ্যাস আটকে, তার থেকে বেশি ভারতের কাছে রয়েছে। দু’তিন সপ্তাহ সমস্যা হবে না। ভারত সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে এলপিজি নিয়ে যে চুক্তি করেছে তা ইতিমধ্যেই আসছে। ফলে গভীর সমস্যা হবে না। তেলের ক্ষেত্রে মজুতের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, গ্যাসে তা নেই। প্রয়োজনে তার উৎপাদন বাড়ানো যায়। তাই তেল মন্ত্রক ৫ মার্চ বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলেছে, এলপিজি উৎপাদন চাহিদার থেকে কম বলে সব রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শোধনগারকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে পুরোদমে প্রোপেন ও বিউটেন উৎপাদন করতে। এগুলি এলপিজি-রমূল উপাদান। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে এই দুই গ্যাস অন্য কোনও পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে। প্রোপেন ও বিউটেন দিয়ে একমাত্র গৃহস্থালির জন্য ব্যবহার্য এলপিজি গ্যাস তৈরি করতে হবে। অন্য কোনও কাজে কোনও ভাবেই এই গ্যাস ব্যবহার করা যাবে না।
কলকাতা ও শহরতলিতে পাইপবাহিত রান্নার গ্যাস সরবরাহ করে বেঙ্গল গ্যাস কোম্পানি। সংস্থার সিইও অনুপম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘গ্যাস নিয়ে সমস্যা নেই। বাড়িতে রান্নার গ্যাস বা গাড়ির সিএনজি সবের জোগানই স্বাভাবিক রেখেছি।’’ তাঁর আশা, সমস্যা শীঘ্রই মিটে যাবে। ফলে আগামী সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিকের দিকে এগোতে পারে। সর্বভারতীয় এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর্স ফেডারেশনের সহ-সভাপতি বিজন বিশ্বাস বলেন, ‘‘এখনও সমস্যা তৈরি হয়নি। তবে তৈরি থাকার নির্দেশ দিয়েছে তেল সংস্থাগুলি। সে কথা মাথায় রেখেই এগোচ্ছি।’’ তিনি জানান, আপাতত গ্যাস দেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন বুকিং, ২১ দিনের ফারাক, ই-কেওয়াইসি-এর মতো নিয়মগুলি কঠোর ভাবে মানা হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ৪-৫ দিনের মধ্যে না শোধরালে বাণিজ্যিকে জোগানে সমস্যা হতে পারে। একই বক্তব্য এইচপিসিএল এলপিজি ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় আগরওয়ালেরও।
পেট্রোপণ্যের ডিলারদেরও বক্তব্য,মোটের উপর সমস্যা নেই। হাওড়ার একটি পেট্রল পাম্পের কর্তা জানান, শুক্রবার পর্যন্ত সমস্যা হয়নি। যা বরাত দেওয়া হয়েছিল, সেটাই পাওয়াগিয়েছে। সংস্থাগুলির থেকে নির্দেশিকা আসেনি। ইন্ডিয়ান অয়েলের এক কর্তা জানান, সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নজর রাখা হচ্ছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)