গত ৬ মে এবং ১৯ মে কালীঘাটে তৃণমূল বিধায়কদের নিয়ে যে বৈঠক করেছিলেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তার নথি প্রকাশ করে দিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসাবে নির্বাচিত করতে কোন কোন বিধায়ক সই করেছিলেন, বৈঠকে কী কী আলোচনা হয়েছিল, তা ওই নথিতে রয়েছে। কারা সই না করে ব্লক লেটারে নিজের নাম লিখেছিলেন, তা-ও দেখা যাচ্ছে নথিতে।
৬ তারিখ বিকেলে ৩০ বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বৈঠকে হাজির ছিলেন ৬৭ জন বিধায়ক। শোভনদেবের দেওয়া নথিতে উপস্থিত হিসাবে তাঁদের সকলের সই রয়েছে। কেউ বাংলায়, কেউ ইংরেজিতে সই করেছেন। পাশে নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের নাম এবং তারিখও লিখেছেন। তবে এর মধ্যে কিছু কিছু নাম লেখা হয়েছে ব্লক লেটারে। তার মধ্যে মহেশতলার বিধায়ক শুভাশিস দাস, বোলপুরের চন্দ্রনাথ সিংহ, খড়্গপুরের দীনেন রায়, ক্যানিং পূর্বের বাহারুল ইসলামেরা রয়েছেন। এই নথির শিরোনাম হিসাবে লেখা হয়েছে— ‘‘তৃণমূলের নবনির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়ে বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা ও মুখ্যসচেতক নির্বাচন সংক্রান্ত সভায় উপস্থিত সদস্যগণ।’’
আরও পড়ুন:
৬ তারিখের চিঠিতে সকলের স্বাক্ষরের নীচে লেখা হয়েছে, সে দিনের সভায় সভাপতি ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন অরূপ রায় এবং তা সমর্থন করেছিলেন চন্দ্রনাথ সিংহ। এই সভায় পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে শোভনদেবের নাম প্রস্তাব করেন মদন মিত্র। সকল সদস্য তা সমর্থন করেন। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন না, তাঁরাও সমর্থনের কথা জানিয়েছেন বলে লেখা হয়েছে। শোভনদেবের দেওয়া নথি অনুযায়ী, ১৯ তারিখের বৈঠকে ৫৯ জন বিধায়কের স্বাক্ষর ছিল। সে দিনও কেউ কেউ ব্লক লেটারে নাম লিখেছিলেন।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দেওয়া নথিতে তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষরের প্রথম পৃষ্ঠা। —নিজস্ব চিত্র।
তৃণমূলের এই চিঠির কিছু কিছু সই জাল করে বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা সে বিষয়ে বিধানসভায় অভিযোগ জানান। তার পর রাজ্য সরকার এর তদন্তভার দেয় সিআইডি-কে। ইতিমধ্যে তারা চার তিন বিধায়কের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহও করেছে। ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল। সেই বহিষ্কৃত ঋতব্রতকেই বিরোধী দলনেতা করতে চেয়ে ৫৯ জন বিধায়কের চিঠি স্পিকারের কাছে জমা পড়ে। ফলে শোভনদেবের পরিবর্তে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হয়েছেন ঋতব্রত। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘‘তদন্ত চলছে। তাই আমার কিছু বলা উচিত নয়। তবে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা এই নথি ভাল করে পরীক্ষা করলে এবং বিধায়কদের ওই দিনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করলেই সত্যিটা জানতে পারবেন। এটুকু বলতে পারি, সই জাল কাণ্ডের যে তদন্ত শুরু হয়েছে, এই চিঠি তাতে আরও ইন্ধন দেবে।’’
নথির বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, এটি হাজিরার চিঠি। বিরোধী দলনেতার নাম প্রস্তাবের চিঠি নয়। তাঁর কথায়, ‘‘এটা যদি নাম প্রস্তাবনার চিঠিই হয়ে থাকে, তবে এটাই কি স্পিকারকে দেওয়া হয়েছিল?’’ নথি প্রকাশ করে শোভনদেব ‘কাঁচা কাজ’ করে ফেলেছেন, মনে করেন ঋতব্রত। তিনি বলেন, ‘‘চিঠির প্রথম দু’টি পাতার সঙ্গে তৃতীয় পাতার রঙের কোনও মিল নেই। ভাল করে লক্ষ্য করলে তা বোঝা যাবে। তা ছাড়া, তৃতীয় পাতায় কারও স্বাক্ষর নেই। এটা বড্ড কাঁচা কাজ হয়ে গিয়েছে।’’
তৃণমূলের বিদ্রোহী এক বিধায়কের কথায়, ‘‘আমাদের ১৯ তারিখের বৈঠকে দু’টি সই করানো হয়েছিল। একটা ছিল হাজিরার স্বাক্ষর। তা ছাড়া, ৬ তারিখের বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করার জন্য একটি সই করানো হয়।’’ এ বিষয়ে কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহার সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।