তিনটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ। তবে তার প্রভাব ছড়িয়েছে বহু দেশ এবং তাদের অসংখ্য মানুষের ঘরে। বিশ্ব অর্থনীতিকে এরই মধ্যে বড় রকমের নাড়া দিয়েছে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত। তা দীর্ঘায়িত হলে সঙ্কট আরও গভীর হবে। এই যুদ্ধে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও, অগ্নিগর্ভ পশ্চিম এশিয়া আতঙ্কে রেখেছে এ দেশের অসংখ্য মানুষকে। হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হওয়ায় এবং তেল-গ্যাস ও ডলারের দাম লাফিয়ে বাড়ায়, ধাক্কা টের পেয়েছে ভারতীয় অর্থনীতি। শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। স্তব্ধ হয়েছে বেশির ভাগ আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। পরিস্থিতি কবে শোধরাবে তার ইঙ্গিত নেই। কারণ, দু’পক্ষই যুদ্ধ থামাতে নারাজ। ফলে ক্ষতি হচ্ছে অনেক শিল্পের। কাজ হারানোর আশঙ্কায় কাঁটা বহু মানুষ। মূল্যবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা। গৃহস্থের ব্যবহারের এবং বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে। বিমান ভাড়াও বেড়েছে।
প্রায় রোজই বড় আকারের পতন দেখছে শেয়ার বাজার। ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারি সেনসেক্স ছিল ৮১,২৮৭। গত শুক্রবার নেমেছে ৭৪,৫৬৪ অঙ্কে। ওই দিন বিদেশি লগ্নি সংস্থাগুলি ১০,৭১৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। সেনসেক্স তার সর্বোচ্চ জায়গা (৮৫,৮৩৬) থেকে এখন ১১,২৭২ নীচে। বহু শেয়ারের দাম কমেছে। ন্যাভ খুইয়েছে বেশির ভাগ শেয়ার ভিত্তিক ফান্ড। গত শুক্রবার সূচক হারায় ১৪৭০। এর পর বাজারে শেয়ার কেনার ঢেউ (শর্ট কভারিং) আসার কথা। তবে তা এলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। আজ বাজার কিঞ্চিৎ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। তাকে সঙ্কট কাটার লক্ষণ না বলাই ভাল।
আমেরিকা ভেবেছিল ইরানকে সহজেই বাগে আনা যাবে। তা হয়নি। পশ্চিম এশিয়ার দেশটি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের কাছে সহজে হার মানবে না। যার পরিণাম ভুগতে হচ্ছে বেশির ভাগ দেশকে। যুদ্ধ কতদিন চলবে বোঝা যাচ্ছে না। অর্থাৎ অনিশ্চয়তা এবং সঙ্কট এখন চলবে। ফলে শেয়ার সূচকেরও এখনই পাকাপাকি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। পরিস্থিতি যা, তাতে লগ্নির জন্য আরও কিছু দিন অপেক্ষা করা ভাল। যাঁরা লগ্নি থেকে বেরোতে চান, টাকার আশু প্রয়োজন না থাকলে তাঁদেরও অপেক্ষা করা উচিত। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু না করাই ভাল। একই পরামর্শ দিয়েছেন বাজার নিয়ন্ত্রক সেবির কর্ণধার তুহিনকান্ত পাণ্ডে। তবে যাঁরা এসআইপি পথে ফান্ডে টাকা জমাচ্ছেন, তাঁরা তা চালিয়ে যেতে পারেন।
ইরান হরমুজ় বন্ধ করায় অশোধিত তেল ১০০ ডলার পার করেছে। ইরান বলছে, জোগান পুরো বন্ধ থাকলে তা ২০০ ডলার ছুঁতে পারে। এটা সত্যি হলে ভারতের মতো তেলে আমদানি নির্ভর দেশ বিরাট সঙ্কটে পড়বে। তার উপর খাঁড়ার ঘা ডলারের দাম। যা শুক্রবার সর্বোচ্চ (৯২.৪৫ টাকা) হয়ে টাকাকে তলানিতে নামায়। চিন্তা কৃত্রিম মেধা এবং আমেরিকার শুল্কজনিত সমস্যাও। এত সব কারণে বাজারে এখন নতুন শেয়ার আসা প্রায় বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্যা গভীর। এখন লগ্নিযোগ্য তহবিল ছোট থেকে মাঝারি মেয়াদে সুরক্ষিত স্থির আয় প্রকল্পে রেখে অপেক্ষা করা যেতে পারে। সূচক পাকাপাকি মাথা তুললে হাঁটা যায় শেয়ার-ফান্ডের পথে। যুদ্ধ থামলে অবশ্য ভূ-অর্থনীতিতে কিছু পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। পরিবর্তন হতে পারে কিছু দেশের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণেও।
(মতামত ব্যক্তিগত)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)