আর্থিক বৃদ্ধির প্রথম পূর্বাভাস মোদী সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলল। ইঙ্গিত মিলল, চলতি অর্থবর্ষের শেষ ছয় মাসের বৃদ্ধি প্রথম ছয় মাসের তুলনায় কমতে চলেছে। মোদী সরকার গত বাজেটে জিডিপি-র বহর যে হারে বাড়বে বলে মনে করেছিল, ততখানি বাড়ছে না। তার ফলে জিডিপি-র তুলনায় ঋণের হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যও পূরণ হবে না বলে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের বাজেটের আগে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের দুশ্চিন্তা, দেশের জিডিপি-র তুলনায় ঋণের হার আগামী পাঁচ বছরেও ৫০ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য ভেস্তে যেতে পারে।
আজ জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর জানিয়েছে, চলতি অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার ৭.৪% ছোঁবে। এটি সরকারের প্রথম পূর্বাভাস। গত অর্থবর্ষ বা ২০২৪-২৫ সালে বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫%। সেই তুলনায় এ বার বৃদ্ধির হার মাথা তুলতে চলেছে বটে। তবে এর অর্থ হল, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ছয় মাসে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৮% ছিল। শেষের ছয় মাসে তা ৬.৮ শতাংশে নেমে আসতে চলেছে। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক ডিসেম্বরের ঋণনীতিতে পূর্বাভাস দিয়েছিল, চলতি অর্থবর্ষের শেষ তিন মাস অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশে নামবে। অর্থ মন্ত্রকের অবশ্য দাবি, ৬.৮% বৃদ্ধিও মন্দ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিন্তার কারণ অন্যত্র। পরিসংখ্যান দফতর জানিয়েছে, বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে বা মূল্যবৃদ্ধি-সহ আর্থিক বৃদ্ধির হার চলতি বছরে মাত্র ৮% ছোঁবে। যা গত অর্থ বছরের ৯.৮ শতাংশের তুলনায় অনেকখানি কম। সর্বোপরি, সীতারামন গত ফেব্রুয়ারিতে বাজেট পেশের সময় এই বৃদ্ধির হার ১০.১% হবে বলে দাবি করেছিলেন। সেই তুলনায় ৮% বৃদ্ধি যথেষ্ট কম বলেই মনে করছেন তাঁরা। এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে জিডিপি ধরে নিয়েই আগামী অর্থবর্ষে তা কোথায় পৌঁছবে তার হিসাব কষে নতুন বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। চিন্তার কারণ হল, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী জিডিপি যথেষ্ট না বাড়লে, সরকারের কর বাবদ আয়ও আশানুরূপ বাড়বে না। ফলে ঋণ বাড়তে পারে। ইওয়াই ইন্ডিয়া-র মুখ্য নীতি উপদেষ্টা ডি কে শ্রীবাস্তবের মন্তব্য, ‘‘জিডিপি-র বহর কমলে কেন্দ্রের কর বাবদ রাজস্ব আয়ে ধাক্কা লাগবে। বাজেট অনুমান অনুযায়ী রাজস্ব আয় হবে না।’’ বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রকৃত জিডিপির হার ৭.৪% এবং মূল্যবৃদ্ধি-সহ ৮% ধরা হয়েছে। ফারাক মাত্র ০.৬%। যার অর্থ, বোঝানো হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির হার কোনও ভাবেই আর মাথা তুলবে না। তাঁদের মতে, এটা আদতে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের জন্য সুদ কমানোর বার্তা।
গত বাজেটে কেন্দ্রের অনুমান ছিল, চলতি অর্থবর্ষে জিডিপি ৩৫৬.৯৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছবে। প্রথম পূর্বাভাস বলছে, জিডিপি ৩৫৭.১৪ লক্ষ কোটি টাকায় ঠেকছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এর ফলে চলতি বছরে রাজকোষ ঘাটতি জিডিপি-র ৪.৪ শতাংশে বেঁধে রাখার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু চলতি বছরে জিডিপি-র তুলনায় ঋণের হার ৫৬.১ শতাংশে কমিয়ে আনার যে লক্ষ্য ছিল, তা পূরণ হবে না। এই হারকে ২০৩০-৩১ সালে ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশে কমিয়ে আনার যে লক্ষ্য ছিল, তা-ও থেকে যাবে অধরা।
পরিসংখ্যান দফতর জানিয়েছে, চলতি অর্থ বছরে কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির হার গত বছরের ৪.৫% থেকে বেড়ে ৭% হবে। কৃষিতে বৃদ্ধির হার ৪.৬% থেকে ৩.১ শতাংশে নামবে। পরিষেবা ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৭.২% থেকে বেড়ে ৯.১% ছোঁবে। বাজারে কেনাকাটার সূচক বা বেসরকারি খরচে বৃদ্ধির হার গত বছরের ৭.২ শতাংশের থেকে সামান্য কমে হবে ৭.১%। নতুন লগ্নির সূচক বা যন্ত্রাংশে খরচ বৃদ্ধির হার ৭.১% থেকে বেড়ে পৌঁছবে ৭.৮%।
দুশ্চিন্তা
চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসে জিডিপি (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) ৮% বাড়লেও, পরের ছ’মাসে তা নামছে ৬.৮ শতাংশে।
এ বার জিডিপি-র তুলনায় ঋণের হার ৫৬.১ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রের। তা পূরণ হবে না।
ঋণের হারকে ২০৩০-৩১ সালে ধাপে ধাপে ৫০ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যও পূরণ হওয়া কঠিন।
কেন্দ্র গত বাজেটে দাবি করে, বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে বা মূল্যবৃদ্ধি-সহ আর্থিক বৃদ্ধি চলতি বছরে ১০.১% ছোঁবে। প্রাথমিক পূর্বাভাস বলেছে, তা নামবে ৮ শতাংশে।
মূল্যবৃদ্ধি-সহ আর্থিক বৃদ্ধির অনুমান গত বারের ৯.৮ শতাংশের থেকে কম।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)